সন্তান বা ছেলেমেয়ে মানুষ করা (Parenting)

যে কোন নারী বা পুরুষের জীবনে বিবাহ একটা বিশেষ ঘটনা, এর জন্য মনে নানা প্রভাব, মানসিক চাপ ফেলতে পারে। বিবাহের সঙ্গে সঙ্গে সন্তানের সম্ভাবনা একটা বিশেষ অবস্থার সৃষ্টি করে। যদি স্বামী স্ত্রীর মধ্যে এ ব্যাপারে মতের মিল থাকে তবে কোন বিশেষ সমস্যা হবার সম্ভাবনা কম।

স্বামী ও স্ত্রীর মানসিক ও দৈহিক মিলনে যে সন্তান আসে, মানুষের ক্ষেত্রে এই শিশু সন্তান বেশ অসহায়। আমরা জানি মানব শিশুই এই জীব জগতে সব চেয়ে বেশী এবং সব চেয়ে বেশী সময় ধরে দেখা শোনার দরকার হয়। তার জন্য অনেক প্রস্তুতির দরকার হয়। আমার জানা নেই যে এর জন্য কোন ইউনিভারসিটি বা কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোন শিক্ষা ব্যাবস্থা আছে। কিন্তু কোন শিশুর মধ্যে কোন ধরনের অবহেলা বা অত্যাচার দেখা যায় তখন সেই শিশুর মা বাবাকে ছেলেমেয়ে মানুষ করার কিছু ট্রেনিং বা শিক্ষা দেওয়া হয়। সুতরাং আমরা ধরে নিই সব মা বাবাই তাদের সন্তানদের মানুষ করতে পারবে।

প্রাচীন কাল থেকেই কোন পরিবারে যদি সন্তান আসে তার দেখা শোনার জন্য পরিবারের বয়স্ক মেয়েরা বা মায়েরা এব্যপারে সব সাহায্য করেন। কিন্তু বর্তমানে একান্নবর্তি বা জয়েন্ট ফ্যামিলি না থাকার জন্য নূতন মা বাবাকেই তাদের নূতন সন্তানকেই দেখাশোনা করতে হয়।

সন্তান আসাতে পরিবারের উপর কি প্রভাব ফেলতে পারে?  

সন্তানের জন্ম হলেই তার নানা চাহিদা যেমন তাকে সব সময় দেখা শোনা করা, ঠিকমত ও ঠিক সময়ে খাওয়ানো, তার স্বাস্থ্যসম্মত ভাবে ঠিক ভাবে দেখা শোনা করা, যাতে তার বেশী ঠান্ডা বা গরম না লাগে। আর তার বয়স অনুযায়ী তার সাথে খেলা করা।

পরিবারের যদি কোন সাহায্য না থাকে, যেখানে কেবল সন্তানের মা বাবাই আছেন তাহলে তাদের সময়ের অনেকটা চলে যায় শিশুর দেখাশোনা করতে। যদি মায়েরা চাকরি করেন তাহলে তাদের চাকরি থেকে ছুটি নিতেই হয়।যদি মাতৃত্বের জন্য বেতন সহ ছুটি না পাওয়া যায় তবে সেই পরিবারে বাড়তি অর্থনৈতিক চাপ পড়ে।

সন্তান যদি শারীরিক দিক থেকে সুস্থ্য থাকে, তবে তাদের দেখা শোনা করতে সাধারণতঃ বিশেষ কোন সমস্যা হয় না। শিশুর কোন ধরনের শারীরিক রোগই মা বাবার মনে মানসিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে। চিকিৎসার খরচের জন্য বাড়তি মানসিক চাপ হয়।

প্রথম সন্তানের জন্য মা বাবার অনেক টেনশন থাকে, যদি সেটা দ্বিতীয় সন্তান হয় তবে তাকে দেখা শোনার ব্যপারে আগের অভিজ্ঞতা থাকার জন্য সেটা কিছুটা সহজ হয়। আবার অর্থনৈতিক দিক দিয়ে আবার চাপ পড়তে পারে। পরিকল্পনা করে কোন শিশুর জন্ম পরিবারে অনেক কম টেনশন বা চাপ ফেলে।

দেখা গেছে শিশুর জন্ম মা বাবার মনে তাদের ছোট বেলার নানা সমস্যার কথা মনে করিয়ে দেয়।

সাধারণতঃ দেখা গেছে যে পুরুষ মানুষেরা তাদের কাজ, বন্ধু বান্ধব, এই সব নিয়েই বেশী ব্যস্ত থাকে, সন্তান মানুষের ক্ষেত্রে তারা বিশেষ অংশ নিতে চায় না।

কি ভাবে সন্তান মানুষ করা যেতে পারে,সে সম্বন্ধে কিছু আলোচনা 

বেশীরভাগ মাতাপিতা তাদের নিজের ধারনা বা জ্ঞান ইত্যাদি থেকেই নিজের সন্তানদের নিজের মত করে মানুষ করেন। এই মানুষ করার সময় শিশুর বা সন্তানের মন বা মেজাজের উপর, এবং মা বাবার মনের উপর নির্ভর করে। মনে করা হয় বেশীর ভাগ মা বাবাই তাদের মা বাবার কাছ থেকে শিখে নেন, যদিও তাদের সবটা তারা নাও নিতে পারেন। মানুষ করার ব্যাপারে ছেলে মেয়ের শিক্ষা বা পড়াশোনা কতটা দেখাশোনা করা দরকার তা বলা শক্ত। কিন্তু আমাদের মত দেশে ছেলেমেয়েদের ক্যারিয়ার বা ভবিষ্যত গড়ার ব্যাপারে মানুষ করার সময় মাবাবা অনেক বেশী জোর দেন।

সাইকোলজিষ্ট বা মনোবিজ্ঞানীরা অনেক বছর আগে (প্রায় ১৯২০ সাল) থেকেই ভাবতে শুরু করেন কি ভাবে মাতাপিতা মানুষ করার সময় শিশুর মনে প্রভাব ফেলে।  এর জন্য অনেক স্টাডি বা নিরিক্ষনের পর জানা গেছে যে “মাবাবার মানুষ করার ষ্টাইল হয়তো অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ন”।

ডায়না বমরিন্ড় ( Diana Baumrind, 1973) লক্ষ্য করেন যে “মাবাবার মানুষ করার উপর নির্ভর করে কি ভাবে তাদের সন্তানেরা পারিপার্শিক অবস্থায় কাজে লাগিয়ে তারা তাদের লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে”। বমরিন্ড দেখেছেন যে চারটি প্রধান ব্যবহার যেটার জন্য মাবারা মানুষ করতে সফল হবার সম্ভাবনা বেশী। যেমনঃ

সংবেদনশীল বা সংবেদনশীল না হওয়া ( Responsiveness vs. Unresponsiveness)

চাহিদা আছে বা চাহিদা নেই (Demanding or Undemanding )

পরে বমরিন্ড মনে করেন যে তিন রকমের মানুষ করার স্টাইল আছেঃ Authoritative (প্রভুত্ব-ব্যঞ্জক), Authoritarian(নিরঙ্কুষভাবে )মেনে চলা, and Permissive(অনুমোদন) ভাবে.

এছাড়া আরো কয়েকটি রকম ভাবে মানুষ করা হয় যেমন, অবহেলা বা যত্নহীনভাবে,এবং  প্রশ্রয়দিয়ে। যে সব পরিবারে অবহেলা, প্রশ্রয় ও অত্যাচার বা মারধোর ইত্যাদি হয় সেই ছেলেমেয়েরা বড় হয়ে তাদের নানা মানসিক সমস্যা হয় ও সমাজিক ভাবে অনেক সমস্যা হবার সম্ভাবনা থাকে।

এটা অনেকেই মানবেন যে, মানুষ করতে গেলে শাস্তি বা মারধোর দেওয়া যেমন ভাল নয় তেমনই একেবারে উদাসীন থাকাও ঠিক নয়। সন্তানদের জন্য কিছু কিছু নিয়ম স্থির করা ও তাদেরকে মেনে চলার জন্য বলা, এবং সাথে সাথে তাদের প্রতি ভালবাসা ও সহানুভূতিশীল হওয়া।

মনে রাখা দরকার যে বেশীরভাগ ক্ষেত্রে মানুষ করার নিয়ম কোন একটা পদ্ধতি বা আদর্শ মেনে চলে না। বিভিন্ন পরিবারে ,বিভিন্ন সমাজে বা দেশে এই মানুষ করার নিয়ম বিভিন্ন রকম।

Authoritative (প্রভুত্ব-ব্যঞ্জক)

এই ধরনের মানুষ করাকে মনে করা হয় সঠিক বা আদর্শ। এতে মা বাবারা সন্তানের শারিরিক ও মানসিক সব রকমের চাহিদার প্রতি বিশেষ সজাগ থাকেন। তাঁরা সব সময় চেষ্টা করেন যাতে সন্তানেরা স্বাবলম্বী হয়, অথচ তাদের উপর কিছুটা নিয়ন্ত্রণ থাকে যতক্ষন না পর্যন্ত তারা প্রাপ্ত বয়স্কঃ হচ্ছে।ছেলে মেয়েদের জন্য তাঁরা কিছু নিয়ম বা নির্দেশ দেন যে গুলো তাদেরকে মেনে চলতে হয়, এবং সঙ্গে সঙ্গে তাদেরকে কিছুটা স্বাধীনতাও দেওয়া হয়। ছেলেমেয়েদের সাথে অনেক সময় মা বাবার অনেক আলোচনা হয় অনেক বিষয় নিয়ে, যাতে তাদের মনে ভয় বা ভুল বোঝাবুঝি না থাকে। ছেলে মেয়েদের অনেক সময় কোন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে তাদের মতামত, ও ইচ্ছা ইত্যাদি জানা হয় যাতে তারা ভবিষ্যতে সেই ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে পারে। মনে রাখতে হবে এই ধরনের মানুষ করাতে পিতামাতা বা অভিভাবকদের তাদের সন্তানদের বিষয়ে অনেক সজাগ থাকতে হবে, এবং তা মেটাতে হবে।

ভুল করলে সন্তানদের শাস্তিও দেওয়া হয়, এবং কেন তাদের শাস্তি দেওয়া হচ্ছে সেটার কারন এবং কেন দেওয়া হচ্ছে সেটা বুঝিয়ে বলা হয়। কোন ধরনের শারিরিক অত্যাচার বা মারধোর করা, বা বন্ধ ঘরে আটকে রাখা, ইত্যাদি অনেক সময় সন্তানদের মনে স্থায়ীপ্রভাব ফেলতে পারে। এমনকি দেখা গেছে যে পরে তাদের নানা মানসিক উপসর্গ যেমন, ডিপ্রেশন( বা মানসিক অবসাদ), টেনশন(বা মানসিক উদ্বিগ্নভাব),এমন কি সাইকোসিস, ও দুষ্কৃতকারী হয়ে যেতে পারে। মনে রাখা দরকার শাস্তির উদ্দেশ্য হ’ল ছেলে মেয়েদের বোঝানো যে যেটা খারাপ ব্যবহার সেটা যেন আর না করা হয়।

Authoritarian (নিরঙ্কুষভাবে )মেনে চলা

এই ধরনের মানুষ করায় ছেলে মেয়েদের কঠোরভাবে নিয়ম মেনে চলতে হয়, কোন ব্যপারে কোন প্রশ্ন করা যাবে না। অনেকটা মিলিটারি স্টাইলের মানুষ করা। একটু ভুল হলেই শাস্তি পেতেই হবে, তারজন্য কোন ধরনের বোঝাবুঝির বা ব্যখ্যার দেওয়ার প্রয়োজন নেই। এই ধরনের মানুষ করায় ছেলেমেয়েদের সাথে মা বাবা বা অভিভাবকদের কোন বিষয়ে আলোচনা হয় না। সন্তানরাও সাধারণতঃ কোন প্রশ্ন তুললে তার সম্বন্ধে কোন উত্তর দেওয়া হয় না। মা বাবারা সন্তানদের মানসিক ও শারিরিক প্রয়োজনের দিকটায় বিশেষ নজর দেন না।

বড় হয়ে এই ধরনের ছেলে মেয়েরা ঠিক স্বাবলম্বী হতে পারে না। তাদের সমাজের সাথে মিশতে কিছু কিছু অসুবিধা হতে পারে। আবার এটাও দেখা গেচ্ছে যে, প্রাচ্যের দেশ গুলি যেমন ভারত, চীন, জাপান ইত্যাদি দেশে এই ধরনের মানুষ করার পদ্ধতিতে অনেক সফলতা হয়েছে। এমনকি পাশ্চাত্য দেশে থেকেও ভারতীয়, ও অন্যান্য এশীয় দেশের মাবাবারা তাদের সন্তানদের সেই সনাতন পদ্ধতিতে মানুষ করেন, যদিও তারমধ্যে অল্পকিছু পরিবর্তন আজকাল লক্ষ্য করা যায়।

মনে রাখা দরকার যদি নিয়ম পালন অতি কঠোর হয়, অত্যাচারের পর্যায়ে চলে যায় তাহ’লে সন্তানেরা মা বাবার থেকে মানসিক ভাবে দূরে চলে যায়,যখন একটু বড় হয় তখন তারা বাড়িছেড়ে পালিয়ে যেতে পারে। সেই ক্ষেত্রে তারা নানা খারাপ সংসর্গে পড়ে যেতে পারে।

Permissive (অনুমোদন) ভাবে মানুষ করা

এই ধরনের মানুষ করাকে এক কথায় বলা যায় প্রশ্রয়দিয়ে মানুষ করা। মা বাবারা সন্তানদের সব কিছুর ব্যাপারে ভীষন সতর্ক থাকেন,কিন্তু সন্তানদের নিয়ন্ত্রণ করার ব্যপারে কিছু ভাবেন না। সন্তানরা যা চায় তাই পায়, তাদের স্বভাবকে কোন ভাবে নিয়ম দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা হয় না। এক কথায় বলা যায় এই ধরনের মানুষ করার ফলে ছেলে মেয়েরা সাধারণতঃ খুব আবেগপ্রবন হয়। বয়ঃসন্ধিকালে নানা রকম খারাপ ব্যবহার, বা অসামাজিক কাজ কর্ম, এমনকি ড্রাগের আসক্তি হতে পারে। তারা তাদের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, সব সময় তারা ধরে নেয় তারা সবকিছু থেকে পার পেয়ে যাবে। অবশ্য যদি কেউ ভাল ভাবে বেড়ে ওঠে তবে সে স্বাবলম্বী হতে পারে, কোন কিছু হার স্বীকার করে নিতে শেখে, আর তার শেখার আগ্রহ থাকবে।

অবহেলা দিয়ে মানুষ করা(Neglectful parenting)

এক্ষেত্রে মা বাবারা সন্তানদের ব্যপারে উদাসীন থাকে। সন্তানদের কোনধরনের প্রয়োজনিয়তা, বা তাদের কোন কিছুর ব্যপারে তারা খোঁজ নেয় না, তারা মানসিক দিয়েও সন্তানদের থেকে দূরে থাকেন। সন্তানদের কোন অসুবিধা বা চাহিদা থাকে সেটা সম্বন্ধে উদাসীন থাকেন, যদিও তাদের খাওয়া থাকা ও অন্যান্য জরুরী জিনিষগুলো ব্যবস্থা করা হয়।

এই ধরনের অবহেলা হয় যদি পরিবারে মানসিক,সামাজিক কোন সমস্যা থাকে, বা মা বাবা দুজনেই যদি উপার্জনের জন্য ব্যস্ত থাকেন,এবং মানুষ করা তাদের কাছে একটা বাড়তি কাজ মনে হয় এবং পরিবারে আর কেউ না থাকে যে ছেলেমেয়েদের দেখা শোনা করতে পারে। মা বাবার মধ্যে মাদক দ্রব্যে আসক্তি ও তাদের মধ্যে যদি মানসিক অসুস্থতা থাকে তাহলেও এই ধরনের অবহেলা হ’তে পারে।

এই অবহেলার জন্য সন্তানের মধ্যে একটা একাকীত্ব ভাব আসতে পারে। কেউ কেউ আবার বাড়িথেকে পালিয়ে যেতে পারে, লেখা পড়া বন্ধ করে দিতে পারে, খারাপ সংসর্গে পড়ে অসামাজিক কাজে জড়িয়ে পড়তে পারে। অনাথ আশ্রমে এই ধরনের মানুষ করা দেখা যায়।

মানুষ করার ব্যপারে ধর্মের প্রভাব

অনেক পাশ্চাত্যদেশে, ও প্রাচ্যের দেশেও নানা ধার্মিক মতের গোষ্ঠিরা তাদের সন্তানদের ধার্মিক নিয়ম অনুসারে মানুষ করেন। বেশীরভাগ ক্ষেত্রে ছেলে মেয়েদের আলাদা ভাবে মানুষ করা হয়। ছেলে দের ক্ষেত্রে এবং মেয়ে দের জন্য বিভিন্ন নিয়ম মানা হয়। সাধারণতঃ তাদের বাইরের সাথে সম্পর্ক বা মেলা মেশা করতে দেওয়া হয় না। অভিভাবক বা পিতা মাতার কঠোর নিয়ন্ত্রনে রাখা হয়, এই ধরনের বন্ধ সমাজে মানুষ হয়ে তারা যখন তাদের সমাজের বাইরে বেরোয় তখন তাদের মানিয়ে নিতে খুবই অসুবিধা হয়। তাদের দৈনন্দিন জীবন যাপন ধার্মিক নিয়ম অনুসারে চলতে থাকে, নিয়ম ভাঙ্গলে তাদেরকে সমাজের থেকে তিরস্কার পায়, আবার প্রায়শ্চিত্ত করতে হতে পারে।

এই ধরনের মানুষ করা কে কি আদর্শ বলা যায়? এই নিয়ে মতভেদ আছে।

মানুষ করার ব্যপারে নীচের বিষয় গুলো গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে

Ø  সন্তান মানুষ করার কোন বিশেষ নিয়ম বা পদ্ধতি নেই। কোন মানুষ করার স্টাইল একেবারে ভুল, আর কোনটা একেবারে ঠিক এটা হতে পারে না।

Ø  মা বাবা বা অভিভাবকেরাই ঠিক করেন কি ভাবে তাদের সন্তানদের মানুষ করবেন।কেউ কেউ পালা করে দেখা শোনা করেন ,কেউ কেউ এটাকে  প্রধান কাজ বলে মনে করেন।

Ø  মানুষ করার ব্যপারে মা বাবারা কি ভাবে মানুষ হয়েছেন তার উপর অনেক সময় নির্ভর করে। কেউ যদি খুব কড়া নিয়মের মধ্যে মানুষ হয়েছেন,এবং তাতে যদি সাফল্য এসেছে,সেক্ষেত্রে তারাও সেই ভাবে তাদের সন্তানদের মানুষ করতে পারেন।

Ø  অনেক পরিসংখ্যান নিয়ে দেখা গেছে যে মারধোর দিলে, বা খুব বেশী শাস্তি দিলে ছেলে মেয়েদের মনে ভবিষ্যতে প্রভাব ফেলে, এবং তাদের নানা মানসিক উপসর্গ,যেমন ডিপ্রেশন বা অবসাদ, টেনশন বা উদ্বিগ্নভাব,এমনকি সাইকোসিস,ও  হতে পারে।

Ø  যে পরিবারে সব সময় ঝগড়া ঝাটি হয়, একে অপরকে শুধু দোষারোপ করে, এবং আবেগপ্রবন হয়, সেই আবহাওয়ায় মানুষ হলে, তাদের ভবিষ্যতে নানা মানসিক সমস্যা হতে পারে।

Ø  মা বাবার মধ্যে কারো যদি ড্রাগ বা মদে আসক্তি থাকে, তবে সেই আসক্তি সন্তানদের মধ্যেও হতে পারে। সে ক্ষেত্রে মা যদি মদ্যপ হয় তার ছেলে মেয়েদের মদ্যপ বা মাদকাসক্তি হবার সম্ভাবনা সব চেয়ে বেশী।

Ø  অনেক সমাজে ছেলেমেয়েরা প্রাপ্ত বয়ঃস্ক হয়ে যাওয়ার পরও মা বাবারা তাদের নিয়ন্ত্রণ ছাড়তে চান না। যে কোন সমস্যা হলেই তাঁরা ছেলে মেয়েদের সাহায্য করতে ছূটে যান। এ ব্যপারে তাদের সন্তানরা চাইলেই তাদের সাহায্য করা উচিৎ। যখন তখন ছেলের বা মেয়ের ফ্যামিলি বা পরিবারের ব্যপারে অনাবশ্যক ভাবে নাক গলালে তাতে সেই পরিবারের মানসিক শান্তি নষ্ট হতে পারে, এমনকি সেই ফ্যামিলি ভেঙ্গে যেতে পারে।

Ø  মনে রাখা দরকার অবহেলা দিয়ে মানুষ করলে, মা বাবারা পরে অবহেলাই পাবেন। 

মানুষ করার ব্যপারে আরো কিছু জরুরী তথ্য

মা বাবার মানসিক স্বাস্থ্যঃ

মানুষ করার ব্যপারে বিশেষ করে মায়ের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর অনেক কিছু নির্ভর করে। মা যদি উদ্বিগ্নতা বা টেনশনে ভোগে তাহ’লে ছেলে মেয়েদের মধ্যে এটা পরে দেখা যেতে পারে। কারন বেশীরভাগ ক্ষেত্রে সন্তানরা সেটা মা বা বাবার কাছ থেকেই শেখে। আবার মায়ের অবসাদ বা ডিপ্রেশন থাকলে সেক্ষত্রে সন্তানদের অবহেলা হতে পারে।অবশ্য বাড়িতে যদি বাবা মা’র মধ্যে একজন যদি ঠিক থাকেন তবে ছেলে মেয়েদের মধ্যে প্রভাব অতটা নাও ফেলতে পারে। এছাড়া একজনের মধ্যে সিযোফ্রেনিয়া বা কোন ধরনের সাইকোসিস থাকলে, ফ্যামিলিতে আর কেউ দেখাশোনার করার না থাকলে সেই ছেলেমেয়েদের অভিভাবকের কোন নিয়ন্ত্র বা গাইডেন্স না থাকার জন্য, অনেকটা অবহেলায় তারা বড় হয়ে ওঠে। এই ভাবে বড় হ’লে তাদের মধ্যে অনেক সময় নানা অসামাজিক ব্যবহার দেখা যায়, যেমন মিথ্যা কথা বলা, চুরি করা, মারা মারি করা, বাড়িথেকে পালিয়ে যাওয়া, পড়াশোনা বন্ধ করে দেওয়া, মদ ও মাদকদ্রব্যে আসক্তি, ইত্যাদি।

লেখা পড়া ও ভবিষ্যতের চিন্তা

এব্যপারে প্রাচ্যদেশগুলি বা এশিয়ার দেশগুলিতে অনেক ভাবা হয়। মা বাবারা সব সময় চেষ্টা করেন তাঁদের ছেলেমেয়েরা যাতে অনেক শিক্ষা পায়, মানে যেমন ইঞ্জিনিয়ার,ডাক্তার,বা এখন সম্প্রতি হয়েছে আই টি বা অথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষা নেয় বা ম্যানেজমেন্ট পড়ে অনেক বড় চাকরি করে। এর প্রধান উদ্দেশ্য হ’ল পরিবারের রোজগার বাড়ানো,এবং মান ও অবস্থার উন্নতি করা।

তারজন্য মা বাবারা পড়াশোনার উপর খুব বেশী চাপ দেন। অনেক সময় সন্তানদের সেই মানসিক বুদ্ধি বা ক্ষমতা না থাকলেও তাদের মধ্যে এই উচ্চাশা জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়।তাঁরা যেটা করতে পারেন নি সেটা তাঁরা সন্তানদের মধ্যে দেখতে চান।

এর ফলে পরীক্ষায় ফেল করলে বা জয়েন্টে ভাল ফল না করতে পারলে সন্তানদের মনে ও পরিবারের সবার মনে গভীর হতাশাঁ, বা নিরাশা ও দুঃখ হয়।এর ফলে কেউ কেউ ঝোঁকের বশে আত্মহত্যা করে ফেলে।

এই জন্য মাতাপিতা বা শিক্ষকদের উচিৎ সন্তানদের মনে অহেতুক আশা বা আকাঙ্খা না জাগিয়ে তোলা,এবং সামর্থ্য অনুযায়ী তাদের ভবিষষ্যতের জন্য প্রস্তুত করা।

পড়াশোনায় হঠাৎ অবনতি হ’লে অভিভাবকের উচিৎ সেটা বোঝার চেষ্টা করা। এই অবনতির কিছু কারণ হোলঃ ছাত্রের মনে যদি টেনশন, অবসাদ বা হতাশা আসে, বা ছটফটে ভাব থাকে তবে পরীক্ষায় ফল খারাপ হতে পারে। এছাড়া বয়ঃসন্ধিকালে হঠাৎ শুরু হতে পারে, সিজোফ্রেনিয়া তার উপসর্গ হোল যেমন, পড়াশোনায় হঠাৎ অবন্তি,খুব একা থাকা নিজের মনে খুব চিন্তা করা, এমনকি নিজের মনে কথা বলা বা হাসা ইত্যাদি।

আর যদি প্রথম থকেই সহজ পড়া না বুঝতে পারে,বা সহজ কাজ না করতে পারে,তাহ’লে বুঝতে হবে মাথায় বুদ্ধিই নেই। তারজন্য বিশেষ ধরনের স্কুলে শিক্ষা নিতে হবে।

মা বাবার উচিৎ ছেলেমেয়েদের সাথে মাঝে মাঝে তাদের ভবিষ্যতের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করা। যদিও অনেকেই সেই  ভবিষ্যতের প্ল্যান পাল্টাতে পারে।

কি খাওয়া দাওয়া করবে?

বাড়ন্ত ছেলে মেয়েদের ঠিক মত বা সুষম খাদ্য দেওয়া উচিৎ।সুষম খাদ্য মানেই যে একগাদা মাছ মাংস বা ডিম খেতে হবে তা নয়। অনেক বা কম পক্ষে পর্যাপ্ত পরিমানে শাকসবজি, কিছু ফল এবং মাছ বা মাংস যেন প্রায়দিনই দেওয়া হয়। যেহেতু কম বয়সে অনেক শারিরিক পরিশ্রম বা খেলেধুলা করা হয়,তারজন্য কার্ব হাইড্রেড জাতিয় খাদ্য বেশী করে দিতে হবে। বেশীরভাগ ছেলেমেয়েদের নানা মুখরোচক ফাষ্ট ফুড ও পানীয় যেমন, আলুর চিপস, বার্গার ইত্যাদি বা নানা হাই এনার্জি পানীয় যেমন কোক, পেপ্সি,লিমকা  খাবার প্রবণতা থাকে। এইগুলি বিশেষভাবে কন্ট্রোল করা দরকার, কারন এতে অস্বাভাবিক দেহের ওজন বৃদ্ধি হতে পারে।

অনেক মা বাবা মনে করেন ভিটামিন টনিকে শারিরিক শক্তি বা বুদ্ধি ও পড়াশোনায় মনোযোগ ইত্যাদির বৃদ্ধি করে। এটা একদম ভুল ধারনা। এখনো পর্য্যন্ত বুদ্ধি বাড়ানোর জন্য কোন ঔষধ বা টনিক আবিষ্কার হয়নি।

কোন ধরনের টেনশন, বা অবসাদ হ’লে ,এমনকি পরীক্ষার সময় বেশীর ভাগ ছেলে মেয়েরাই টেনশনের জন্য তাদের খাওয়া কমে যেতে পারে। তখন যা করে হোক,এমনকি জোর করে কিছু পরিমাণে খেলে, একটু শারিরিক ব্যায়াম করলে টেনশন কমে যাবে এবং খাওয়া দাওয়া স্বাভাবিক হবে।

উঠতি বয়সে “খাওয়ার রোগ” (Eating disorder) হতে পারে, যদিও সেটা পাশ্চাত্য দেশেই বেশী দেখা যায়। যেমন কেউ অত্যধিক বেশী খেয়ে, কোন শারিরিক এ্যাক্টিভিটি বা ব্যয়াম না করে দেহের ওজন অনেক বেড়ে মোটা হয়ে যায়। তারফলে তাদের ডিপ্রেশন হতে পারে। আবার কেউ কেউ এমন কম খায়, বা অনেক খাওয়ার পর গলায় আঙ্গুল দিয়ে বমি করে সব বার করে দেয়, এর ফলে তাদের দেহের ওজন অনেক কমে গিয়ে একদম অস্থিচর্মসার হয়ে যেতে পারে। এই ধরনের অবস্থাকে “অ্যানোরেক্সিয়া নারভোসা” (Anorexia Nervosa) বলে। এই ধরনের অপুষ্টিজনিত অবস্থা প্রাচ্যের দেশ বা এশিয়ার দেশগুলিতে বিশেষ দেখা যায় না। পাশ্চাত্যদেশে উঠতি বয়সের মেয়েদের মধ্যেই বেশী হয়।

ড্রাগ ও অ্যালকোহল এর ব্যবহার

এই সম্বন্ধে প্রায় সব সমাজেই একমত যে অপ্রাপ্ত বয়ঃস্কদের কোন ধরনের ড্রাগ বা মদ্যপান করা উচিৎ না। কিন্তু যে সব পরিবারে মা বাবারা, বা অন্যান্য প্রাপ্ত বয়স্করা ড্রিংক করেন বা মদ্য পান করেন, বা সিগারেট খান তাদের ছেলেমেয়েরা একটু বড় হলেই বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে অনেক কম বয়সেই সেই সব ব্যবহার করা শুরু করে। যদিও আজকাল সিগারেট খাওয়ার সম্বন্ধে অনেক বাধানিষেধ আছে, মদ্যপান সম্বন্ধে আমাদের সমাজের যে একটা বাধানিষেধ ছিল সেটা যেন ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। মনে রাখতে হবে অ্যালকোহল একটি মাদক দ্রব্য, এটা সব সময় শরীরের ক্ষতি করে, (যদিও অনেকে মনে করেন সীমিত পরিমাণে মদ্যপান হার্টের রোগ কম হয়), এটা সাময়িক ভাবে মনের টেনশন কমিয়ে দিলেও, পরে মনের মধ্যে অবসাদ বা ডিপ্রেশন করে। গাড়ির দুর্ঘটনার একটা প্রধান কারন হ’ল মদখেয়ে গাড়িচালান।

কি ধরনের পোষাক পরবে বা সাজগোজ করবে?

এই নিয়ে পরিবার অনেক ঝামেলা হতে পারে, বিশেষ করে বয়ঃসন্ধিকালের ছেলেমেয়েদের ক্ষেত্রে। ছেলে মেয়েরা কি ধরনের পোষাক পরে সেটা নির্ভর করে অনেক সময় মা বাবার উপর,পারিপারর্শিক অবস্থা উপর। রক্ষনশীল সমাজে অনেক বাধানিষেধ থাকার জন্য ছেলে মেয়েরা যদি অন্যদের মতো হবার চেষ্টা করে তবে তা নিয়ে পরিবারে অশান্তি হতে পারে।

অনেক সময় পোষাক দিয়ে বোঝা যায় পারসোনালিটি স্টাইল কেমন। যারা খুব উগ্র জমকালো পোষাক পরে, তবে তাদের মধ্যে অন্যদের অ্যাটেনশন বা আকর্শণ করার প্রবণতা থাকে, তারা সংবেদনশীল হয়, একটুতেই মনে উত্তেজনা বা আঘাত লাগে,সব সময় তারা পার্টি বা সামাজিক অনুষ্ঠানে নিজেদেরকে সেন্টারে ভাবতে থাকে বা চায়।

এটাও দেখা যে যৌন উত্তেজক ভাবে সাজগোজ করলে সমাজে দুষ্কৃতকারি বা বাজে লোকজন নানাভাবে উত্তক্ত করতে পারে, তারজন্য নানা বিপদের সম্ভাবনা থাকে।

হঠাৎ কেউ যদি তার সাধারন পোষাক না পরে, উগ্র বা ঝকমকে পোষাক পরে, তবে এটা একটা অস্বাভাবিক মানসিক পরিবর্তনের জন্যোও হতে পারে। যেমন আবার বিপরীত অবস্থাও হতে পারে। নোংরা জামা কাপড় পরছে,ঠিক মত স্নান ও পরিষ্কার না করার জন্যগায়ে গন্ধ বেরচ্ছে এটাও একটা অস্বাভাবিক অবস্থা।

কখন যৌন শিক্ষা দেবেন

এ ব্যপারে নানা মতভেদ আছে। রক্ষনশীল সমাজে বা দেশগুলিতে মনে করা হয় অপ্রাপ্তবয়ঃস্কদের যৌনশিক্ষা দেওয়ার প্রয়োজন নেই কারন তারা মানসিক ভাবে প্রস্তুত নয়। যদিও এখনো অনেক সমাজে অপ্রাপ্তবয়সে ছেলে মেয়েদের বিবাহ দেওয়া হয়। আরো মনে করা হয় যদি যৌন শিক্ষা দেওয়া হয় তাহ’লে অপ্রাপ্তবয়সেই ছেলে মেয়েরা অবাধ যৌন ক্রিয়া করবে, তাতে সমাজের নৈতিক ভাবে অবনতি হবে।

পাশ্চাত্যদেশ গুলিতে মনে করা হয় ছেলে মেয়েদের আগে থেকে যৌন জ্ঞান না দিলে,তারা কৌতূহল এর জন্য নানা বাজে জায়গা থেকে যেমন সেক্স ম্যাগাজিন,বা ইন্টারনেট ইত্যাদি থেকে নানা অজ্ঞানের শিকার হবে। যৌন জ্ঞান থাকলে, তারা সাবধানতা নিলে  অন্তঃসত্তা হয়ে পড়বে না, কোন ধরনের যৌণ ব্যধি হবে না। পাশ্চাত্যদেশে অবিবাহিত মায়েদের মেনে নেওয়ার প্রবণতা অনেক বেশী, সেক্ষত্রে প্রাচ্যের দেশ গুলিতে কুমারী মায়ের সমাজে বাস করা বেশ কঠিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *