মানসিক আঘাতজনিত উদ্বিগ্নতা (Posttraumatic Stress Disorder) or PTSD

PTSD র বাংলায় কোন প্রতিশব্দ নেই। এর তর্জমা করা বেশ কঠিন। আমার মনে হয় “মানসিক আঘাতজনিত উদ্বিগ্ন ভাব”  হয়ত কিছুটা কাছাকাছি হতে পারে।

যে কোন মানসিক বা শারীরিক আঘাতের পরে কারো কারো মনে নানা উপসর্গ হতে পারে। সেই অবস্থাকেই বলা হয় পি টি এস ডি। এই ব্যপারে আমার একটা উদাহরণ মনে পড়ছে, “ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পায়”। সেই রকম হয় এই অবস্থাতেও। কেউ যদি একটা গাড়ির দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে যান তবে তার গাড়িতে উঠলে ভয় হতে পারে। গাড়িতে উঠলেই ভয়,বুক ধড়ফড় করা, মাথাঘোরা, মনে হতে পারে যেন সেই দুর্ঘটনাটা আবার যেন হচ্ছে। সেই সময় তার আশেপাশে কি হচ্ছে তার জ্ঞান থাকেনা। কেউ কেউ দুর্ঘটনার পর আর গাড়িতেই উঠতে পারে না। এমনকি ঐ ধরনের ঘটনা দেখলে বা শুনলে মনের মধ্যে ভয়,উত্তেজনা, এবং সাংঘাতিক একটা উদ্দিগ্নতা ভাব হয়।

এই ধরনের মানসিক আঘাত অনেক ঘটনাতেই হতে পারে। যেমন, কেউ যদি দৈহিক ভাবে অত্যাচারিত হয়, বা যৌন অত্যাচার বা ধর্ষন (রেপ), বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন বন্যা, ভূমিকম্প জন্য পরিবার ও সম্পত্তির ক্ষতি হয়। তাছাড়া উদ্বাস্তু অবস্থা, যেটা আমাদের দেশ বিভাগের জন্য হয়েছিল।সেই সময় অনেকের আত্মীয় স্বজন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার জন্য মারা গেছেন,যারা বেঁচে গেছেন তাদের সারা জীবন সেই আতঙ্ক মনের মধ্যে রয়ে গেছে। যখনই সেই দাঙ্গার কথা হয়, বা কোথাও সেই ধরনের ঘটনা ঘটে তখন তাদের মনে সেই পুরানো আতঙ্ক বার বার ফিরে আসে।

পি টি এস ডি র নাম করন এবং এর শ্রেনীবিভাগ

বিশেষজ্ঞরা অনেক বছর ধরেই লক্ষ্য করেছেন যে দুর্ঘটনা বা মানসিক আঘাতে মনের মধ্যে অনেক প্রভাব ফেলতে পারে। মানসিক আঘাতের পর এই ধরনের উদ্বিগ্নভাব বা অবস্থা জ্যাকব ডি কস্টা (Jacob DeCosta) ১৮৭১ সালে প্রথম বর্ননা করেন আমেরিকান গৃহ যুদ্ধের সেনাদের মধ্যে। তখন মনে করা হয়েছিল যে, সেই সব সৈনিকদের “হার্টের উত্তেজনা” বা হার্টের দুর্বলতা । প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় সেই একই ধরনের উপসর্গ হতে লাগল, তখন মনে করা হোত বোমার জন্য ব্রেনের ক্ষতি হবার জন্য। সেই রকম উপসর্গ আবার পাওয়া গেল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সৈনিকদের মধ্যেও, পাওয়া গেল নাৎসি কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের বন্দিদের মধ্যেও। তারপর আরো নানা যুদ্ধের ফেরত সৈনিক যেমন ভিয়েতনাম যুদ্ধের ফেরত সৈনিকদের মধ্যে,এবং সম্প্রতি ইরাক,আফগানিস্থানের ফেরত সেনাদের মধ্যেও।

কিন্তু পি টি এস ডি ডায়গনোসিসের কথা প্রথম ভাবা হোল ১৯৮০ সালের শেষদিকে।এই নামটা প্রথমে দেয় আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েস্যান, তার পর ধীরে ধীরে সারা বিশ্বে এই ডায়াগনোসিসটা বিশেষজ্ঞরা মেনে নিলেন। বর্তমানে এই ডায়াগনোসিসের রোগীদের যেমন অনেক চিকিৎসা পদ্ধতি বেরিয়েছে, তেমন এই ডায়াগনোসিসটার অনেক অপব্যবহারও হচ্ছে। সে সম্বন্ধে পরে আলোচনা করব।

অনেক আগে মনে করা হোত যারা আগেথেকেই মানসিক দিক দিয়ে দুর্বল বা সংবেদনশীল তারাই হয়ত এই ধরনের মানসিক আঘাতের শিকার হয়। পরে লক্ষ্য করা গেল যে এমনকি যারা মানসিক দিক দিয়ে বেশ সুস্থ্য ও সবল, তাদেরও যুদ্ধের থেকে ফেরত আসার পর নানা মানসিক উপসর্গ দেখা গেল।

কি ধরনের মানসিক আঘাত মনের উপর প্রভাব ফেলতে পারে?

আমাদের দৈনন্দিন জীবনে নানা মানসিক আঘাতের ঘটনা ঘটে,যেমন হঠাৎ চাকরি চলে যাওয়া, বা কেউ পরীক্ষায় ফেল করে গেল, বা হঠাৎ স্বামী স্ত্রীর মধ্যে ছাড়াছাড়ি হোল, বা কারো অনেক সম্পত্তির খোয়া গেল ইত্যাদি। কিন্তু এই সব মানসিক আঘাতেও মনের মধ্যে প্রভাব ফেলতে পারে। সমীক্ষা করে দেখা গেছে যে, এই ধরনের মানসিক আঘাতে এক হাজারের মধ্যে মাত্র চার জনের আঘাতজনিত উদ্দিগ্নভাব হয়েছে।

সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে, মানসিক আঘাতের পরিমাণটা অনেক বেশী হলে তবে মনের মধ্যে প্রভাব ফেলে, যদিও ওই পরিমাণটার সঠিক মাত্রা কি সেটা মাপা বেশ কঠিন, আর সেই মাত্রাটাও আবার নানা জনের ক্ষেত্রে নানা রকম। সেই জন্য বলা হয় মানসিক আঘাতের পরিমাণটা এমন হবে যেটা বেশীরভাগ মানুষের ক্ষেত্রেই অসহনীয় বা সহ্যের বাইরে।

এই ধরনের মানসিক আঘাত হতে পারে ভীষণ যে কোন দুর্ঘটনা যাতে প্রান যাওয়ার আশঙ্কা ছিল, বা এক চুলের জন্য বেঁচে গেছেন, বা ওই ধরনের সাংঘাতিক ঘটনা নিজের চোখে কেউ দেখেছে।

যৌন অত্যাচার বা রেপ(বলাৎকার),শারীরিক অত্যাচার যাতে প্রান যাওয়ার আশঙ্কা থাকে ইত্যাদি অবস্থাতেও মানসিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে।

যুদ্ধের সময় বন্দির উপর অত্যাচার, বা অন্য বন্দিদের অত্যাচার দেখা বা তাদেরকে মেরে ফেলা ইত্যাদি দেখাও মনের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে।

এই ধরনের মানসিক আঘাতের কি কি উপসর্গ হতে পারে ?

সব চেয়ে প্রধান উপসর্গ হোল, প্রথম আঘাতের সময় যে অবস্থা হয়েছিল মনে হবে সেটা যেন আবার হচ্ছে। যতই চেষ্টা করা হোক না কেন সেই অবস্থাটা যেন ফিরে ফিরে আসতে থাকে। কোন ধরনের ইঙ্গিতে বা কিছুর দ্বারা ওই অবস্থাকে মনে করিয়ে দিলে সেই অতীত ঘটনার আবার মনে ফিরে আসে,একে বলা হয় ফ্ল্যাশব্যাক, অনেকটা সিনেমার ফ্ল্যাশব্যাকের মত।

সেই ঘটনার কথা যখনই মনে হয়, তখন মনের মধ্যে অস্বাভাবিক কষ্ট বা অসুবিধা হয়। মনে পড়ার সাথে সাথে, ভয় হতে পারে। বুক ধড় ফড় করা, শরীরের মধ্যে উত্তেজনা,ঘাম হওয়া,মাথা ঝিম ঝিক করা, আশে পাশে কি হচ্ছে তার কোন হুশ থাকে না। সেই সময় সে সেই অবস্থা থেকে মুক্তি পাবার জন্য অন্য জায়গায় চলে যেতে চায়।

মনের মধ্যে সব সময় সেই ঘটনার কথা মনে হতে থাকে।কিছুতেই সেই ঘটনার কথা ভুলতে পারে না। এমনকি সেই ঘটনা মনের মধ্যে অনেকটা ছবির মতো স্পষ্ট করে থেকে থেকে ফুটে ওঠে। যেমন, কেউ গাড়ীর দুর্ঘটনার আওয়াজ রাতে শুনতে থাকে কারন সেই দুর্ঘটনাটা রাতে হয়েছিল বলে। একজন আফগানি উদ্বাস্তু রাতে ঘুমাতে পারতো না,কারন রাতে সে জোরে রকেটের আওয়াজ শুনতো। কাবুলে তাদের বাড়িতে রাতে তালিবানের ছোড়া রকেট পড়ার জন্য ধ্বংস হয়ে যায়। তার ভাই, মা, বাবা,আরো আত্মীয়স্বজন মারা যায়।সে সেই সময় বাড়িতে ছিল না বলে সেই একমাত্র বেঁচে যায়।

রাত্রে ঘুমের মধ্যে নানা খারাপ ও ভয়ঙ্কর স্বপ্ন হতে থাকে। স্বপ্নগুলো খুব স্পষ্ট মনে হয়, স্বপ্নগুলো অনেক ভয়ের হয়। অনেক সময় ঘুমতেই ভয় লাগতে পারে। সেইজন্য কেউ কেউ সারা রাত জেগে থাকে, কারন চোখ বুজলেই মনে হয় সেই আতঙ্কজনক ঘটনা গুলো শুরু হচ্ছে বা শুরু হবে। ঘুমের থেকে ভীষণ ভয় খেয়ে জেগে উঠতে পারে। সেই সময় বুক ধড় ফড় করে, ঘামে সারা গা ভিজে যেতে পারে, বেশ ভয় লাগতে পারে। কেউ কেউ ঘুমের মধ্যে চিৎকার, বা নানা কথা বলতে পারে। কেউ যদি সেই সময় তাকে ডাকে বা গায়ে হাত দিয়ে জাগানোর চেষ্টা করে তবে সে বুঝতে পারে না। জাগলেও বুঝতে পারে না কোথায় আছে।স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে বেশ কয়েক মিনিট লাগতে পারে। অস্বাভাবিক অবস্থার সময় সে মারমুখী হতে পারে। স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসার পরে আগের অবস্থার কথা সে মনে নাও করতে পারে।  এই ধরনের স্বপ্নকে বলা হয়, Nightmare বা ঘুমের মধ্যে আতঙ্ক।

অনেকে যে ঘটনার জন্য মানসিক আঘাত হয়েছে সেটা সে ভুলতে চেষ্টা করে। আবার কেউ কেউ মনের মধ্যে সব সময় সেই ঘটনাটা নানা প্রশ্ন হতে থাকে। ভাবতে থাকে কেন এমন হ’ল, কি করলে সেটা না হ’তে পারতো, নিজেকে অনেক সময় দোষ দিতে থাকে। কখনো কখনো মনের মধ্যে খুব ভাবতে থাকে কি ভাবে প্রতিশোধ নেবে। এই ভাবে চলতে থাকার জন্য কখনোই সেই ঘটনাকে মনের মধ্যে মেনে নিয়ে,যা হবার হয়েছে এই ভেবে স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারে না।

তাদের মধ্যে নানা ভাবের পরিবর্তন হয়, যেমন, অত্যধিক ভয়, বা রাগ,দুঃখ, অনুশোচনা, এবং মনে করে যে তারা অনেক খারাপ কাজ করেছে। আবার মনে হতে পারে যে মনে কোন অনুভুতিই নেই।

অনেকে এই সব অসুবিধার জন্য অ্যালকোহল বা মদ খেতে শুরু করে। মদ খেলে সাময়িক ভাবে মনের মধ্যে উদ্বিগ্ন ভাব, ভাল না লাগা, বা ঘুমের অসুবিধা ইত্যাদি তে সুবিধা হয়। মদ খেয়ে সেই মানসিক আঘাতের ঘটনাটা ভুলতে চেষ্টা করে। কিন্তু মদের নেশা কেটে গেলেই আবার সেই মনের চিন্তা, অসুবিধাগুলো ফিরে আসে। এর জন্য অনেকের মদে বা অন্যান্য ড্রাগে আসক্তি হয়।

কি ধরনের মানসিক আঘাতে এই উদ্বিগ্ন ভাবের সম্ভাবনা বেশী ?

রেপ বা বলাৎকার হ’লে বেশী মানসিক আঘাতের সম্ভাবনা থাকে। এছাড়া কাউকে যদি বন্দি অবস্থায় রাখা হয়,তাকে প্রানে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়, তাহ’লে তাদের মানসিক আঘাত পাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়। শিশুদের ক্ষেত্রে তাদেরকে অবহেলা করা হয়, বা শারীরিক ভাবে অত্যাচার করা হয় তবে তাদের মনে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক আঘাত লাগতে পারে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন বন্যা, ভূমিকম্প, বা ঘরে আগুন লাগা ইত্যাদি অবস্থায় যারা পড়েছেন তাদের মধ্যে পি টি এস ডি হবার সম্ভাবনা অপেক্ষাকৃত কম।

রিফিউজি ও যুদ্ধবন্দিরা যাদের উপর শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার হয়েছে তাদের মধ্যে এই অবস্থা হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশী।

পরিসংখ্যানে দেখা গেছে যে পুরুষদের থেকে মেয়েদের পি টি এস ডি হবার সম্ভাবনা বেশী।

পি টি এস ডি বা মানসিক আঘাতজনিত উদ্বিগ্ন ভাবের কারন কি বা কেন হয় ?

এর কারন সঠিক ভাবে এখনো জানা যায় নি। তবে মনে করা হয় ( ফ্রয়েড এর মতে)মানসিক আঘাতের ফলে আগের কোন মনের দন্দ্ব যেটার সমাধান হয়নি সেই দন্দ্বের আবার পুনরুজ্জীবিত হবার জন্য এই ধরনের উদ্দিগ্নভাব হয়। মানসিক আঘাতের ফলে সে আবার শিশু বয়সের মানসিক অবস্থায় ফিরে যায় এবং মনের মধ্যে একটা সমতা আনার চেষ্টা করে। যারা মনের ভাব ভাষায় ঠিকভাবে প্রকাশ করতে পারে না (Alexithymia) তারা কোন ধরনের মানসিক চাপ (Stress) এ পড়লে মনকে তারা স্বাভাবিক ভাবে রাখতে পারে না। তাদের মধ্যে এই ধরনের উদ্দিগ্নভাব হবার সম্ভাবনা থাকে।

কেউ কেউ মনে করেন, যাদের মানসিক আঘাত লাগে তারা সেই আঘাতকে ঠিক ভাবে সামলাতে বা Process করতে পারে না। যখনই ওই ধরনের কোন মানসিক চাপ বা ওই ধরনের মানসিক আঘাতের মতো অবস্থায় আসে তখন তাঁরা সেটাকে না সামলে বা না সম্মুখীন হয়ে সেটাকে এড়িয়ে যায়।

মনে করা হয়, যখন কোন মানসিক আঘাত লাগে তখন সেই আঘাতের সাথে অন্যান্য পারিপার্শিক অবস্থার সাথে একটা যোগ বা সম্বন্ধ হয়। তার ফলে যখনই ওই ধরনের পারিপার্শিক অবস্থা আসে বা পড়ে তখনই সেই আগের মানসিক আঘাতের কথা মনে করিয়ে দেয়। সেটা মনে পড়লেই সেই আগের মতো ভয়, বা আতঙ্ক ফিরে আসে। আতঙ্কের সাথে সাথে শারীরিক উপসর্গ যেমন বুক ধড় ফড় ক্রা,মাথা ঘোরা,ঘাম হওয়া, মনে হতে থাকে জ্ঞান হারিয়ে যাবে। আবার কারো কারো মনে রাগ উত্তেজনা হয়,তখন মারমুখী হতে পারে। বেশীরভাব ক্ষেত্রে ভুক্তভুগী সেই অবস্থা থেকে নিজেকে সরিয়ে আনে। আর সেই ধরনের অবস্থাকে সব সময় এড়িয়ে চলে।

যেমন,কেউ যদি একটা ভীষন ট্রেন দুর্ঘটনা থেকে বেচেঁ গেছেন,সে ট্রেনে উঠলেই তাঁর সেই ঘটনার কথা মনে হয়ে অস্বাভাবিক উদ্বিগ্ন ভাব বা উত্তেজনা হতে পারে। এমনকি ট্রেনের আওয়াজ শুনলেও মনের মধ্যে মানসিক অস্বস্তি হতে পারে। তারজন্য সে ট্রেনে ওঠা বা ষ্টেশনে যাওয়া বন্ধ করে দিতে পারে।

এই ধরনের আঘাতে কি ব্রেন বা মস্তিষ্কে কোন চোট লাগে?

সেই সম্বন্ধে সঠিক জানা যায় নি। তবে যাদের পি টি এস ডি র মতো উপসর্গ হয়, তাদের দেহে নানা নিউরোট্রান্সমিটার  যেমন,    Norepinephrine, dopamine, ইত্যাদির পরিমাণ বেড়ে যায়। তার ফলে তাদের হার্টের গতি, রক্তের চাপ, ঘুমের অসুবিধা ইত্যাদি হতে থাকে।

এছাড়া যাদের এই ধরনের উদ্বিগ্নভাব থাকে তাদের রক্তে ও মস্তস্কে স্ট্রেস হরমোন যেমন, করটিকোট্রফিন (Corticotrophin), & Glucocorticoid hormones এর পরিমাণ বেশীরভাগ সময় বেশী থাকে।

সম্প্রতি মনে করা হচ্ছে যে ব্রেনে বা মস্তিস্কে হিপ্পোক্যাম্পাস (Hippocampus) নামে একটা অংশের পরিবর্তন হয়। ব্রেনের হিপ্পোক্যাম্পাসের  পরিমাণ কমে যায়,যদিও এটা সবার ক্ষেত্রে পাওয়া যায় নি।

নানা ধরনের পরীক্ষা নিরীক্ষার পর কোন বিশষ অস্বাভাবিকতা বা শারীরিক ক্ষতি এখনো পাওয়া যায় নি যার জন্য পি টি এস ডি ডায়াগনোসিস করা যেতে পারে।

সাধারণতঃ কি কি ভাবে এরা ডাক্তারের কাছে বা বিশেষজ্ঞের কাছে যায় ?

একটা কেস যেটা আমার ক্লিনিকে বেশ কয়েক বছর আগে এসেছিল সেটা এই রকমঃ

পঞ্চান্ন বছরের এক বিধবা মহিলাকে(নাম ধরা যাক মায়া) আমার ক্লিনিকে রেফার করেন এক স্ত্রীরোগ বিশষজ্ঞ, কারন ওই মহিলা বার বার বলছেন যে, তিনি অন্তঃসত্তা আছেন,এবং ঠিক মত গর্ভপাত করা হয়নি। স্ত্রী বিশেষজ্ঞের জানান তিনি মায়ার একবার অপারেশন করেন,যদিও তিনি করতে চাননি, কারন পরীক্ষার দ্বারা জানতে পারেন যে তিনি অন্তঃসত্তা ছিলেন না। বার বার অনুরোধ করার জন্য অপারেশন করতে হয়। মায়ার পরনে ছিল সাদা কাপড়,মাঝারি গড়নের,বেশ মানসিক ভাবে উত্তেজিত ছিলেন, আমাকে বললেন যে,মাস খানেক আগে ওনার যুবক বয়সের ছেলে কাজের সুত্রে বাড়ির বাইরে এক রাত্রে যেতে হয়েছিল, তার জন্য সে তার বন্ধুকে তাদের বাড়িতে থাকতে বলে, কারন তাঁর সব সময় কেমন একটা উদ্বিগ্নভাব সেই জন্য কেউ থাকলে হয়তো মনে জোর পাবেন। সেই ছেলের বন্ধু একই পাড়াতে বা গ্রামে থাকে,আর সবাই তাকে চেনে এবং ওই মহিলাও তাকে চেনেন বেশ কয়েক বছর ধরে। সুতরাং তার বাড়িতে থাকা নিয়ে মনে কোন সংশয় বা ভয় ছিল না।

মায়া আরো বললেন সেই রাতেই ছেলের বন্ধু তাঁর সাথে জোর করে সেক্স করে বা রেপ করে। তারপর তিনি সারা রাত ভয়ে, লজ্জায়, কোন রকমে কাটিয়ে দেন। ছেলে পরের দিন ফিরে এলেও তাকে বলতে পারেন নি। সেই থেকে মনের মধ্যে ঘুরতে থাকে যে যদি তিনি অন্তঃসত্তা হয়ে যান, যদি সেই বলাৎকারি ছেলের বন্ধু সবাইকে জানাজানি করে দেয়। তার পর মহিলা বাইরে যাওয়া বন্ধ করে দেন, মনে হতে থাকে যেন অন্তঃসত্তার উপসর্গ যেমন, বমি ভাব, দুর্বলতা, পেট ফুলে যাওয়া ইত্যাদি হতে লাগল। ঘুমের মধ্যে আতঙ্কে জেগে উঠেন, সারাদিন কাজকর্ম করতে পারেন না।

এই অবস্থাটাকে অনেকটা পি টি এস ডি র মতো, কিন্তু এটাকে সাধারণতঃ বলা হয় Acute stress disorder. (এর সঠিক বাংলা করা বেশ শক্ত) এই অবস্থাটা যদি মাসের পর মাস চলতে থাকে, এবং হয়তো পরে পি টি এস ডি বা আঘাত জনিত উদ্দিগ্নভাব বলা যেতে পারে।

আরো জানাগেল যে,মায়ার মাসিক বন্ধ হয়ে গেছে বছর পাঁচেক আগে, এবং তাঁর স্বামী মারা গেছেন প্রায় দশ বছর আগে। মায়ার অনেক আগে থেকেই উদ্দিগ্নতা ভাব ছিল, মনের মধ্যে সব সময় অজানা ভয় ভয় করতো, সেটা স্বামী মারা যাবার পর বেড়ে গেছিল। ছেলে দিনের বেলায় বাড়িতে প্রায়ই থাকে না।সে ব্যাবসার জন্য খুব ব্যস্ত থাকে। এই ঘটনার আগে মায়া কয়েকবার ডাক্তার দেখিয়ে ছিলেন। আমাদের মত দেশে যেখানে সাইকোথেরাপি বা কথার দ্বারা চিকিৎসা(টকিং থেরাপি,Talking therapy) সেই সময় হ’ত না বললেই চলে,তাই ডাক্তার শুধু ডিপ্রেশন ও টেনশন কমাবার জন্য ঔষধ দিয়েছিলেন। তাতে মায়ার সাময়িক ও আংশিক ভাবে সুস্থ্য বা ভাল ছিলেন।

ইতিহাস নিয়ে জানাগেল যে, কুমারী অবস্থায়,যখন তাঁর বয়স কেবলমাত্র তের বছর সেই সময় তাঁকে পাড়ার বা গ্রামের এক বয়স্ক ব্যক্তি দ্বারা যৌনভাবে নিগৃহীত হয়েছিলেন। সেই থেকে সব সময় মনের মধ্যে ওই ধরনের ভয় বা ভীতি ছিল। আর এই ধর্ষনের পর এই উপসর্গ শুরু হোল।

যখনই মায়া বাইরে বেরোতেন তখনই তার মনে হোত এই ব্যপারটা হয়তো ছেলেটা সবাইকে বলে দিয়েছে। সেই মনে করে মনের মধ্যে আতঙ্কের ভাব হোত। মাথা ঘোরা, বুক ধড়ফড় করা, মনে হয় যেন অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাবেন। সেই ভয়ে কখনো আর একা বাড়ির বাইরে যেতে পারতেন না। রাতে ঘুমের মধ্যে স্বপ্নের আতঙ্কে সারা রাত ঘুমতে পারতেন না,কারন রাতেই সেই রেপের কথাটা মনে পড়ে যেত।দিনের বেলায় অনেক পরিশ্রান্ত হয়ে কয়েক ঘণ্টা ঘুমতেন।

এর থেকে বোঝা যায় এই ধরনের অবস্থায় কি ধরনের উপসর্গ নিয়ে ডাক্তারের কাছে আসে। এর সম্বন্ধে আগেই লেখা হয়েছে।

কি চিকিৎসা করা হয় ?

অনেক রকমের চিকিৎসার কথা বলা হয়। বিশেষজ্ঞের মতে যখনই কোন সাংঘাতিক দুর্ঘটনা ঘটে তখন দুর্ঘটনায় যারা পড়েছেন তাদের কাউন্সেলিং বা সাইকোথেরাপি দেওয়া দরকার। তাহলে তাদের মধ্যে ভবিষ্যতে এই ধরনের উদ্বিগ্নভাব হওয়ার সম্ভাবনা কম হয়। এই ধরনের কাউন্সেলিং যারা দেবেন বা থেরাপিষ্ট তাদের স্পেশাল ট্রেনিং দরকার।

বেশীর ভাগ পি টি এস ডি রোগীদের মধ্যে আরো অন্যান্য মানসিক উপসর্গ থাকে যেমন মানসিক অবসাদ ভাব( Depression), উদ্দিগ্নভাব (Anxiety), আর বেশীরভাগ রোগীরই ঘুমের অসুবিধা হয়(যেমন ঘুম আসতে দেরী হয়, ঘুমটা ভাঙ্গা ভাঙ্গা হয়,ঘুমের মধ্যে বার বার জেগে যায়, ঘুমের মধ্যে আতঙ্ক, সকালে ঘুম থেকে জেগে মনে হয় সারা রাত ঘুমই হয় নি,সকালে ক্লান্ত ভাব লাগে)।

এর জন্য অনেক ডাক্তার যে ঔষধগুলি দেন সেগুলি হোলঃ (নীচের ঔষধগুলির সম্বন্ধে আরো জানতে হ’লে “ঔষধ সম্বন্ধে আলোচনায়” দেখুন)

১) ফ্লুওক্সোটিন (Fluoxetine ), প্যারোক্সোটিন (Paroxetine ), সিটালোপ্রাম (Citalopram ), ভেনলাফ্যাক্সিন ( Venlafaxine), সারট্রালিন (Sertraline) ইত্যাদি, এর মধ্যে সমীক্ষা করে দেখা গেছে যে প্যারোক্সেটিন ও সারট্রালিন সব চেয়ে ভাল উপকার দেয়।

২) ইমিপ্রামিন (Imipramine ), নরট্রিপ্টাইলিন (Nortriptyline ), ইত্যাদি

৩) লোরাজেপাম (Lorazepam ), ক্লোনাজেপাম (Clonazepam ), ডায়াজেপাম (Diazepam ), ইত্যাদি (এই ঔষধগুলি খুব সাবধানে দেওয়া উচিৎ, এক দু সপ্তাহের বেশী এক নাগাড়ে দিলে রোগীর ওই ড্রাগের প্রতি অ্যাডিকশন বা আসক্ত হয়ে যেতে পারে। সেই জন্য খুব জরুরি অবস্থা ,যেমন মানসিক আতঙ্ক ইত্যাদি ছাড়া দেওয়া হয় না)

সাইকোথেরাপি (Psychotherapy) বা টকিং থেরাপি (Talking therapy)

বেশীরভাগ থেরাপিতে চেষ্টা করা হয়, যে মানসিক আঘাতের জন্য উদ্বিগ্নভাব হচ্ছে সেই আঘাতের মানসিক দিক দিয়ে একটা সমাধান করা। অনেক ভুক্তভোগী সেই আঘাতকে ভুলে যেতে চান। কিন্তু তা ভুলতে পারেন না, সেই ঘটনাটাকে কখনো মেনে নিতে পারেন না, মনের মধ্যে অনেক সময় প্রতিশোধ, বা অক্ষমতা, হতাশা আসে। থেরাপিতে চেষ্টা করা হয় সেই গুলোকে মানসিক ভাবে ম্যানেজ করতে।

মনের মধ্যে যে সন্দেহ ভাব থাকে,বা কাউকে বিশ্বাস না করতে পারা, ইত্যাদিও সমাধান করার চেষ্টা করা হয়। অনেক সময় কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাসের থেরাপিতে রোগীকে সাহায্য করলে, রোগী ঠিক মত ঔষধ খেতে পারে ( কয়েকদিন ঔষধ খাবার পর অনেক সময়ই রোগীরা মনে করেন ঔষধে কিছু উপকার হবে না)ধীরে ধীরে মনের মধ্যে একটা আস্থাভাব হয়, আর মনের অবস্থার উন্নতি হতে থাকে। ঔষধ খেলে ঘুম ঠিক হবার জন্য, মনের মধ্যে ক্লান্তি ভাব কম হয়, দৈনন্দিন কাজ করতে পারেন। কাজ করতে থাকলে চিন্তা কম হয়,কাজ করে শরীরে ক্লান্তি হ’লে ঘুমও ধীরে ধীরে ভাল হতে থাকে।

যাদের ড্রাগের বা মদে আসক্তি আছে, তাদের সেই আসক্তি ছাড়ানোর জন্য বেশীদিন ধরে চিকিৎসা দিতে হতে পারে। সাইকোথেরাপি দ্বারা যখন স্ট্রেশ বা মানসিক চাপের কম হয়, তখন ড্রাগ বা মদ খাবার প্রবণতাও কমে। এমনকি সেরে ওঠার পরেও যদি কোন ধরনের আবার মানসিক চাপ, বা ছোট খাট মানসিক চোট লাগে তবে আবার আগের উপসর্গগুলো ফিরে আসতে পারে।

এই ধরনের উদ্দিগ্নভাবের কি পরিণতি হয় ?

সাধারণতঃ এই ধরনের উদ্বিগ্নভাব বা পি টিএস ডি মানসিক আঘাতের পরেই , কখনো বা এক সপ্তাহ থেকে মাস, এমনকি কয়েক বছর থেকে অনেক বছর পরে হতে পারে। উপসর্গ গুলি কম বেশি হতে থাকে,সেটা নির্ভর করে মানসিক চাপের উপর। দেখা গেছে প্রায় এক তৃতীয়াংশ ভাগ রোগী এর অবস্থা থেকে চিকিৎসা ছাড়াই সেরে উঠে। প্রায় চল্লিশভাগ রোগীর কম বা কিছু উপসর্গ হয়, কুড়ি ভাগের বেশী ভাবে ভুগতে থাকে। দশ ভাগ রোগীর অনেক দিন বা বছর ধরে এই ধরনের উপসর্গ চলতে থাকে।

দেখা গেছে খুব কম বয়সের ও বেশী বয়সে মানসিক আঘাত পেলে বেশী ক্ষতি হয়। কারন কম বয়সে মানসিক আঘাত সহ্য করার ক্ষমতা কম থাকে,আর বেশী বয়সে এই আঘাতকে মেনে নিতে পারে না কারন মনের মধ্যে কঠিন ভাব থাকার জন্য।

এছাড়াও যদি শরীরে কোন অক্ষমতা থাকে, বা মানসিক আঘাতের আগে থেকে যদি কোন উদ্বিগ্নভাব,বা অবসাদ ভাব থেকে থাকে,বা কারো যদি পারসোনালিটিতে নানা অস্বাভাবিকতা থাকে যার জন্য অন্যদের সাথে মানিয়ে চলতে অসুবিধা হয়, তাহলে তাদের ক্ষেত্রে মানসিক আঘাতের পর এই উদ্বিগ্নভাব বা টেনশন অনেকদিন ধরে চলতে থাকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *