আত্মহত্যা কি ভাবে কমানো যেতে পারে

আত্মহত্যা কমাতে গেলে কেন কেউ আত্মহত্যা করে সেটা জানা দরকার। সেটা জানলে আত্মহত্যার সম্ভাবনা কমানো যেতে পারে। তাছাড়া আত্মহত্যা একটা বেশ জটিল বিষয়, এতে ব্যক্তিগত, পরিবার, সমাজ সব কিছু কোন না কোন ভাবে জড়িয়ে আছে। সুতরাং আত্মহত্যা কমাতে গেলে ব্যক্তিগত ভাবে, পরিবারগত ভাবে এবং সামাজিক দিক দিয়ে, ও পরিসেবার দিক দিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।

ব্যক্তিগত ভাবে কি করা উচিৎ ?

আত্মহত্যার চিন্তা মনে এলে সেটা নিজের মধ্যে না রেখে কারো সাথে কথা বলা একান্তই দরকার। কারন, না হ’লে আত্মহত্যার চিন্তা মনের মধ্যে ঘুরতেই থাকবে ও তারজন্য মনের মধ্যে চাপ বাড়তে থাকবে। আপনার সব চেয়ে কাছের জনের সাথে কথা বলুন। সে যেই হোক না কেন। নিজের পরিবারের কারো সাথে যেমন, মা বাবা, ভাই বোন, স্বামী বা স্ত্রীর সাথে, এমনকি বন্ধু বান্ধবদের সাথে। কেউ না থাকলে, যেটা সাধারণতঃ খুব কমই হয়, ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করুন।

নিজের মনকে প্রশ্ন করুন কেন এই মরে যাবার কথা মনে হচ্ছে। মনটা কি ইদানিং কালে খুব খারাপ হয়ে গেছে? মনে আনন্দ ও ফুর্তি নেই? আগে যা যা ভালো লাগত সেই সব আর ভালো লাগছে না ? মনের মধ্যে চাপ অনুভূত হচ্ছে ? যে মনের চাপের কারন হয়তো আগেই ছিল ,না এখন হয়েছে। মনে হচ্ছে পরিবার বা সমাজ থেকে দূরে চলে গেছেন? একা হয়ে গেছেন? আবার কেউ কেউ মনের মধ্যে রাগের জন্য বা প্রতিশোধ নেবার জন্য এই আত্মহত্যার কথা ভাবতে থাকেন,সেই রকম রাগ হচ্ছে না তো?

অনেকে এই আত্মহত্যার টেনশন বা ডিপ্রেশন (বা মনের অবসাদ) কাটাবার জন্য মদ্য বা অ্যালকোহল পান করতে থাকেন। এর ফলে আত্মহত্যার প্রবণতা আরো বেড়ে যায়।

সেই সব কারনে আত্মহত্যার কথা মনে হলেই সব চেয়ে কার্যকারি ব্যবস্থা হোল কারো সাথে কথা বলা (অনেক সময় তাহলে মানসিক চাপ কমানোর কোন না কোন সমাধান বেরিয়ে আসবেই ) , একা না থাকা, কোন ধরনের ড্রাগ, বা মাদক দ্রব্য ও অ্যালকোহল ব্যবহার না করা এবং মনের অবসাদ অবস্থার জন্য ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করুন।

পরিবারের কেউ আত্মহত্যার কথা বললে অন্যদের কি কর্তব্য ?

পরিবারে কেউ আত্মহত্যা করলে অন্যদের সজাগ থাকা দরকার। জীবিতদের মধ্যে কেউ যদি মৃতের সাথে মানসিক ভাবে খুব জড়িত থাকে তাহলে সেও আত্মহত্যার পথে যেতে পারে।

আত্মহত্যার করার আগে থেকে বোঝা যেতে পারে তাঁদের মনের পরিববর্তন থেকে। যেমন মনে ডিপ্রেশন বা অবসাদ ভাব আসতে পারে। অন্যদের সাথে মেলা মেশা বন্ধ করে দেয়, লেখা পড়ায় মনোযোগ থাকে না ,যার জন্য পড়ায় পিছিয়ে পড়ে, কাজে যেতে চায় না, একটুতেই রেগে যায় বা সব সময় বিরক্তি ভাব, ঠিকমত ঘুমায় না, শেষ রাতের দিকে জেগে বসে থাকে, খাওয়া কমিয়ে দেয়,তারজন্য অনেক রোগা হয়ে যেতে পারে, ইত্যাদি উপসর্গ হতে পারে। কেউ কেউ বলতে পারে যে আর বেঁচে থেকে লাভ নেই। জীবনটা ব্যর্থ হয়ে গেছে, ভবিষ্যতে কোন আশা নেই। আর যদি ডিপ্রেশন আরো বেশী গভীর হয় তাহলে কেউ কেউ কানে নানা রকম কথা শুনতে পারে যেমন, “ তোর জীবনের কোন দাম নেই”, তোর বেঁচে থেকে লাভ কি? তোর মরে যাওয়াই ভাল”, এখনি মরে যা”।

এই ধরনের উপসর্গ থাকলে ধরে নিতে হবে যে ডিপ্রেশনের অবস্থা খুব সাংঘাতিক স্তরে পৌছেচে। তখন এই ধরনের রোগীকে বাড়ীতে রাখা বিপদজনক কারন তাঁরা যে কোন সময় আত্মহত্যা করতে পারে।

এটা হয়ত অনেকেই লক্ষ্য করে থাকবেন যে এক ধরনের মানুষ আছেন যাঁরা খুব রাগী, স্পর্শকাতর, মানে একটুতেই তাঁদের মনে খুব আঘাত লাগে, বা যখন তাঁদের কোন কিছু চাহিদা না মেটে তখন তাঁরা ঝোঁকের মাথায় অনেক ক্ষতিকর কাজ করে ফেলে। এই ধরনের চরিত্রের আভাষ অনেক ছোট বয়স থেকেই লক্ষ্য করা যায়। তাঁরা ছোট বেলাতে বা বয়ঃসন্ধিকালে ঝোঁকের মাথায় মরে  যাওয়ার জন্য বিষ খেতে পারে, বা অন্য ধরনের আত্মহত্যার চেষ্টা করতে পারে। এরা আত্মহত্যা করার আগে কোন ধরনের সংকেত বা ইঙ্গিত নাও দিতে পারে। সেজন্য এদেরকে একটু সাবধানে সামলাতে হবে। এদের অনেকেই বড় হয়ে মদ্য পান বা অন্যান্য ধরনের মাদকদ্রব্য ব্যবহার করতে পারে। পরিবারে তাঁদেরকে মানিয়ে নিতে প্রায়ই অসুবিধা হতে পারে।

এরা প্রায়ই মেনে নিতে চায় না যে এটা তাদেরই সমস্যা, অন্যদের সমস্যা নয়। সে জন্য তাঁরা কোন ধরনের সাহায্য নিতে অস্বীকার করে।

সমাজিক স্তরে কি ভাবে আত্মহত্যার কমানো যেতে পারে

স্কুল, কলেজ বা কাজের জায়গায় যদি কেউ কারোর বিশষ পরিববর্তন লক্ষ্য করেন তবে সেটা কতৃপক্ষকে বা তাঁদের ফ্যামিলি বা পরিবারকে জানান উচিৎ। সব রকম প্রতিষ্ঠানে আত্মহত্যা, ও অন্যান্য মানসিক স্বাস্থ্যের সম্বন্ধে সচেতনতা গড়ে তোলা উচিৎ যাতে কোন ধরনের মানসিক সমস্যার শুরুতেই যেন তার সারানোর চেষ্টা করা যেতে পারে।

সে জন্য স্কুলে, বা যে কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের মানসিক রোগ সম্বন্ধে জানা দরকার, যাতে তাঁরা ছাত্রের মধ্যে কোন ধরনের মানসিক চাপ বা সমস্যা হলে যেন বুঝতে পারেন এবং তার প্রতিকারের ব্যবস্থা করতে পারেন।

অনেক দেশেই আত্মহত্যার কোন খবর সংবাদপত্র বা টিভি ইত্যাদিতে প্রকাশ করা হয় না। কারন এই ধরনের সংবাদ প্রকাশের পর কেউ কেউ আত্মহত্যার পথ বেঁছে নেন।

সরকারি স্তরে বা স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান কি ভাবে আত্মহত্যা কমাতে পারে?

প্রায় প্রত্যেক পাশ্চাত্য দেশেই এমনকি কিছু কিছু এশিয়ার দেশে ইমারজেন্সি টেলিফোন ব্যবস্থা আছে যেটা চব্বিশ ঘণ্টা চালু থাকে। সুতরাং কারোর  মনে যদি মরে যাওয়ার ভাবনা খুব আসতে থাকে, বা মনকে খুব  চঞ্চল করে দেয় তাহলে সেই নাম্বারে ফোন করলে ইমারজেন্সি বা আপৎকালিন সাহায্য পাওয়া যেতে পারে।

আবার সেটা সম্ভব না হলে অনেকে পুলিশকে ফোন করতে পারেন। এ সব জানা সত্ত্বেও আত্মহত্যাকারী অনেক সময় কোন সাহায্য নিতে চান না, সে ক্ষেত্রে বাড়ির লোকজন বা বন্ধু বান্ধব বা পাড়া পড়শি যে কেঊ ইমারজেন্সি নাম্বারে বা পুলিশে ফোন করে দিতে পারেন।

আর সরকারি স্তরে টিভি,রেডিও, বা সংবাদপত্রে জনসাধারণের মানসিক রোগের সম্বন্ধে প্রচার চালাতে পারে। ডিপ্রেশন বা অবসাদ রোগের সম্বন্ধে বিশেষ করে প্রচার করা দরকার কারন এটাই আত্মহত্যার একটা প্রধান কারন।

সন্তান প্রসবের পর মায়ের ডিপ্রেশন ও তাঁদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতাঃ

প্রায় প্রত্যেক সমাজে ও দেশে দেখা গেছে যে সন্তান জন্মাবার কিছু সপ্তাহের মধ্যেই মায়ের মধ্যে ডিপ্রেশন বা অবসাদ ভাব আসতে পারে। যে সব মায়েরা আগে থেকেই অবসাদে ভুগছিলেন, বা যাদের মধ্যে অবসাদের ভাব ছিল, তাঁদের এই অবসাদ ভাব বেড়ে যেতে পারে। এমনকি যারা হয়তো আগে থেকেই অবসাদের চিকিৎসার ঔষধ খাচ্ছিলেন তাদেরও সন্তান প্রসবের পর বাড়াবাড়ি হতে পারে।

অনেক সময় ডাক্তাররা অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় মানসিক রোগের ঔষধগুলি বন্ধ করে দেন, কারন না হ’লে শিশুর ক্ষতি হতে পারে। সন্তান জন্মাবার পরই, আবার ঔষধ চালু করে দেন।

সন্তান জন্মাবার পর বেশীরভাগ মায়েদেরই দুর্বলতা, ঘুম কম হওয়া, মনে অবসাদ ভাব, কাজে কর্মে মন লাগে না, এমনকি বাচ্চাকে ঠিকমত দেখাশোনা করেন না। যদি অবসাদের মাত্রা খুব বেশী হয়, এমনকি মনে করতে পারেন যে সন্তানের বিকলাঙ্গ। যদি আরো খারাপের দিকে যায় তাহ’লে কেউ কেউ কানে নানা কথা শুনতে পারেন, যেন কেউ বলছে সন্তানকে মেরে ফেলতে।

কোন কোন অবসাদগ্রস্থ মায়েদের আত্মহত্যার কথা আসতে পারে। কানে শুনতে পারেন কেউ যেন বলছে মরে যেতে। এর ফলে মা তখন সন্তানকে মেরে ফেলে নিজে আত্মহত্যা করেন।

যদি অবসাদের মাত্রা কম হয়, তবে পরিবারের অন্যদের সাহায্যে সেটা বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই ধীরে ধীরে ঠিক হয়ে যায়। অবসাদের সময় সদ্যজাত শিশুকে দেখা শোনার জন্য পরিবারের অন্যকাউকে দায়িত্ব দেওয়া উচিৎ বা যেখানে সেটা সম্ভব নয়, যেমন বেশীর ভাগ পাশ্চাত্য দেশে, সেখানে সরকারি স্তরে সেই মায়েদের ও সন্তানকে দেখাশোনার জন্য সামাজ কর্মী বা নার্স বাড়িতে এসে সাহায্য করেন।

অবসাদের মাত্রা বেশী হ’লে, মা যদি সন্তানকে দেখা শোনা না করতে পারেন তবে সেই সন্তানকে সরিয়ে নিয়ে অন্য কারো হাতে দেখাশোনার ভার দেওয়া হয়। মায়ের চিকিৎসার জন্য মানসিক রোগের ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করা হয়।

ভবিষ্যতের মা যাতে আবার অন্তঃসত্ত্বা না হয়ে পড়েন সে জন্য ব্যবস্থা নেওয়া দরকার, এবং যদি অন্তঃসত্ত্বা হয়েও পড়েন তবে যেন ডাক্তারের সাথে সব সময় পরামর্শ করা হয়।

গন আত্মহত্যা ও  আত্মহত্যার চুক্তি

একসঙ্গে অনেকে বা একের বেশীজন আত্মহত্যার ঘটনা ইতিহাসে, এমনকি এখনো মাঝে মাঝে শোনা যায়। সাধারণতঃ এই ধরনের সমবেত বা একসঙ্গে আত্মহত্যা হয়েছে কোন ধর্মীয় গ্রুপ বা Cult গ্রুপের সদস্যদের মধ্যে। এছাড়া কখনো কখনো পরিবারের সকলে এক সঙ্গে আত্মহত্যা করা, বা প্রেমিক ও প্রেমিকার একসাথে আত্মহত্যাও এক ধরনের চুক্তি করে আত্মহত্যা করা। প্রেমিক প্রেমিকারা যখন কোন সামাজিক কারনে বা ধর্মীয় কারনে মিলিত হতে পারে না তখন তাঁরা এক সঙ্গে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। এব্যপারে আত্মহত্যার নোটে বা চিঠিতে তাঁরা জানিয়ে থাকে যে এ জন্মে তাঁরা মিলিত হতে পারছে না তাই পর জন্মের মিলিত হবার জন্য আত্মহত্যার পথ বেছে নিল।

আমাদের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে রাজস্থানে রাজপুত রমণীরা “জওহর ব্রত” করে একসাথে চিতায় ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন কারন মুসলিম আক্রমণের পর তাঁদের সম্মানের হানির থেকে বাঁচতে। এই আত্মহত্যার ইতিহাস এখনো গৌরবের সঙ্গে লেখা আছে, এই জওহর ব্রত রাজস্থানের চিতরে হয়েছিল ১৩০৩, ১৫৩৫ এবং ১৫৬৮ খ্রীষ্টাব্দে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানী কামাকাজি যোদ্ধারা বিপক্ষের যুদ্ধ জাহাজে বিমান সুদ্ধ ঝাঁপিয়ে আত্মহত্যা করেছিল। এছাড়াও জাপানে নিজেদের পেটে ছুরি মেরে আত্মহত্যা করেন,এটাকে বলা হয় সেপুকু (Seppuku ceremony) আত্মহত্যা।

১৯৭৮ সালে জিম জোন্স, ‘People of Temple” এর প্রতিষ্ঠাতা গায়নার জোন্সটাউনে ৯০৯ জন সদস্য বা ঐ “Cult” এর মতে যারা বিশ্বাসী তাঁরা এক সঙ্গে মৃত্যু বরন করেন বা আত্মহত্যা করেন। এর মধ্যে ২৭৬ জন শিশুও ছিল।

মাত্র কয়েক দশক আগে ১৯৯৭ সালে আমেরিকার সান ডিয়াগো শহরে “স্বর্গের দ্বার, বা Heaven’s gate” এ বিশ্বাসী সদস্যরা একসঙ্গে আত্মহত্যা করেন। তাঁরা বিশ্বাস করেছিলেন যে স্বর্গের থেকে এক অন্তর্যান যেটা একটা ধূমকেতুর পিছনে আসছে সেটাতে যেতে হ’লে নিজেদের আগে মৃত্যু বরন করতে হবে। আত্মহত্যার জন্য তাঁরা নিজেরা ড্রাগ নিয়ে, তারপর শ্বাস বন্ধ করে মারা যান একে অন্যদের দ্ধারা। এই আত্মহত্যা চলতে থাকে তিনদিন ধরে, এবং সব সুদ্ধ উনচল্লিশ জন মারা যান।

এই প্রবন্ধের প্রথমে যে আত্মহত্যার কথা লেখা হয়েছে সেটা একটা “ আত্মহত্যার চুক্তি বা চুক্তি করে আত্মহত্যা”। কেন ঐ তিন মহিলা এই চরম পথ বেছে নিলেন? এর নানা কারন হতে পারে যেমন,

তাহলে তাঁদের কি পরিবারের খুব নিকট জন মারা যাবার জন্য কয়েকদিনের মধ্যে খুব বেশী ডিপ্রেশন বা অবসাদ ভাব হয়েছিল যার জন্য তাঁরা নিজেদের  আর বেঁচে থাকার আর প্রয়োজন মনে করেন নি? না কি তারাও ভেবেছিলেন মৃতের সঙ্গে অন্য জন্মে মিলিত হতে চেয়েছিলেন? অবশ্য তাঁরা যদি পর জন্মে বিশ্বাস করেন তবে এই ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

এটাও হতে পারে তাঁদের মধ্যে যে সব চেয়ে প্রধান ব্যক্তিত্ব বা যাঁর মতেই অন্যরা বিনা প্রশ্নে সব কিছু মেনে চলেন তাঁর হয়ত খুব বেশি ডিপ্রেশন বা অবসাদ হয়ে ছিল। তারজন্য তাঁর মনে হয়েছিল যে বেঁচে থেকে আর লাভ নেই। তবে সে হয়ত অন্যদের উপর এমন মানসিক প্রভাব ফেলেছিল যার জন্য সবাই মনে করেছিল আত্মহত্যাই সব চেয়ে ঠিক সিদ্ধান্ত।

এটা বেশ বোঝা যাচ্ছে যে এই আত্মহত্যার পেছনে কোন হঠকারিতা (বা Impulsiveness) নেই। তাঁরা বেশ প্ল্যান করেই আত্মহত্যা করেছিলেন। তাঁরা তাঁদের সব সম্পত্তি বিশ্ববিদ্যালয়কে দান করেন, যাতে কোন ভাবে তাঁদের এই মন ভাব প্রকাশ না পায় তার জন্য তাঁরা যথেষ্ঠ গোপনতা নিয়ে ছিলেন। অবশ্য আমার জানা নেই তাঁরা কোন আত্মহত্যার চিঠি বা নোট লিখেছিলেন কিনা। আর চৌত্রিশ তলা থেকে ঝাঁপ দিয়ে মরা একটা নিশ্চিত মৃত্যু,এর থেকেও বোঝা যায় তাঁরা মরে যাওয়ার কতটা স্থির সিদ্ধান্ত নিয়ে ছিলেন।

আবার মনোস্তত্ববিদরা মনে করেন যে মানসিক ব্যথা বা কষ্ট এই আত্মহত্যার একটা প্রধান কারন। যখন মানসিক ব্যথা সহ্যের বাইরে চলে যায় তখন তাঁরা আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। এই অবস্থাটা হয়ত তাঁদের ক্ষেত্রেও হয়েছিল। তাছাড়া বেঁচে থাকার জন্য যে কারন সেগুলো যদি আর না থাকে বা সেগুলো যদি আর তাঁদের কাছে আর দরকারি মনে না হয় তবে তারজন্যও  আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দিতে পারে।

যাইহোক যে কোন আত্মহত্যার যদি মনস্তাত্বিক পোষ্ট মর্টেম করা যায় তাহ’লে হয়ত কারন গুলো সঠিক ভাবে জানা যেতে পারে। মনে রাখা দরকার আত্মহত্যার কোন একটা কারনে হয় না,অনেক কারন এক সঙ্গে থাকে, এবং এটা জানতে হলে আত্মহত্যাকারির জীবনটাকে ভাল ভাবে পরীক্ষা করতে হবে। এটা জানলে হয়ত এই ধরনের আত্মহত্যা এড়ানো যেতে পারে।

আত্মহত্যা

মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে দক্ষিন কোলকাতায় সাউথসিটির চৌত্রিশ তলার ছাদ থেকে তিন মহিলা ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন। জানা গেছে যে দুই মেয়ে যাদের বয়স পঞ্চাশের কিছু বেশী, অবিবাহিত, এবং তাঁদের মা, সত্তরের উর্ধে এক সঙ্গে মরণ ঝাঁপ দেন। আরো জানা গেছে যে, সেই মেয়েদের বাবা তার কিছুদিন আগে একটা বেসরকারি হাসপাতালে মারা যান। বাবার মৃত্যুর পর মেয়েরা, এবং সদ্য বিধবা স্ত্রী, তাঁদের সব সম্পত্তি এক বিশ্ববিদ্যালয়ে দান করেন, তারপর রাতের দিকে সাউথসিটিতে ওই বিলন্ডিঙ্গে ছাদে উঠেন, এবং বেশ রাতের দিকে, সম্ভবত শেষ রাতের দিকে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন।

এখন যতই অনুসন্ধান হোক না কেন, এটা হয়ত আর কখনো জানা যাবেনা যে তাঁদের মনে কি ঘটেছিল যার জন্য এই অস্বাভাবিক, ও সাংঘাতিক সিদ্ধান্ত নিতে হোল।

আমরা জানি প্রানীর সহজাত প্রবৃত্তি হোল যে বেঁচে থাকা। যে কোন অবস্থাতেই চেষ্টা করে যাতে শরীরের ক্ষতি না হয়। সুতরাং নিজেকে ধ্বংস করে ফেলা একটা অস্বাভাবিক অবস্থা নিশ্চয়।

আত্মহত্যা বলতে বোঝায় কেউ নিজের ইচ্ছায় মৃত্যু বরন করেছে। যারা আত্মহত্যা করেন তাদের কেউ কেউ মানসিক ভাবে, এমনকি শারীরিক ভাবে ভুগতে পারেন। আবার কেউ কেউ নিজের প্রান নিজেই বিনাশ করেন রাগের বশে, বা ঝোঁকের মাথায়। কেউ কেউ নিজে মরতে চায়নি, কিন্তু নিজেকে এমন পরিস্থিতির মধ্যে ফেলেন যে আকস্মিক ভাবে বা অসাবধানতা বসত নিজেকে মেরে ফেলেন। কেউ কেউ প্রতিবাদ করতে, বা সমাজের কোন অবিচারের জন্য আত্মহত্যাকে বেছে নেন। কেউ আবার অন্যকে প্ররোচনা দিয় নিজেকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেন।

এটা দেখা গেছে যে শিশুদের মধ্যে, দশ বছর বয়সের আগে মৃত্যু সম্বন্ধে কোন ধারনা থাকে না। সুতরাং যে কোন মৃত্যুই ওই বয়সের আগে ধরে নেওয়া যেতে পারে আত্মহত্যা নয়। সেটা হত্যা বা দুর্ঘটনা বা অন্য কিছু।

আত্মহত্যার সম্বন্ধে বিভিন্ন ধর্ম কি বলে?

আত্মহত্যার কথা বিভিন্ন ধর্মে উল্লেখ আছে। যেমন, বাইবেলে আছে, জুডাস যিশু খ্রীষ্টকে রোমানদের হাতে ধরিয়ে দেবার পর, যখন তাঁর বিচারে ক্রশে ঝোলানোর সিদ্ধান্ত হোল, তখন মনের অনুশোচনায় সে গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলে আত্মহত্যা করেছিল। বাইবেলে আত্মহত্যাকে একেবারে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। হিন্দু শাস্ত্রে ও ধর্মেও আত্মহত্যাকে মেনে নেওয়া হয় না, বলা হয়েছে যে, আত্মহত্যা করলে নরকে স্থান হবে। ইসলাম ধর্মেও আত্মহত্যাকে একেবারে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এছাড়া অনেক সমাজেই আত্মহত্যা করার ব্যপারে কোন ভাবেই কেউ যেন আইডিয়া না পায়, বা সমাজের সম্মতি না পায় সেটা দেখা হয়।

সারা বিশ্বে আত্মহত্যার পরিসংখ্যানে কি পাওয়া গেছে?

আন্দাজ করা হয় যে সারা বিশ্বে ১০ থেকে ২০ লক্ষ মানুষ আত্মহত্যা করেন। বেশ কিছু দেশে, বিশেষ করে পাশ্চাত্য দেশে কম বয়সে আত্মহত্যাই মৃত্যুর একটা প্রধান কারণ।  কোন কোন পাশ্চাত্য দেশে গাড়ির দুর্ঘটনা থেকে বেশী আত্মহত্যায় মৃত্যু হয়। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী বিশ্বে প্রতি এক লক্ষে ষোল জনের মৃত্যু হয় আত্মহত্যা করে। তার মানে হ’ল বিশ্বে প্রতি মিনিটে এক জনের মৃত্যু হয় আত্মহত্যা করে।

শেষ পঞ্চাশ বছরে আত্মহত্যার করার প্রবণতা বেড়ে চলেছে। পূর্ব ইউরোপের দেশগুলিতে এবং চীন, জাপানে আত্মহত্যার রেট বেশী। এছাড়া পুরুষেরা মেয়েদের থেকে বেশী সংখ্যায় আত্মহত্যা করেন। একমাত্র চীনেই মেয়েরা বেশী সংখ্যায় আত্মহত্যা করেন।

এছাড়া বয়ঃস্কদের মধ্যে আত্মহত্যা করার প্রবণতা বেশী। অনেক পাশ্চাত্যদেশে বয়ঃস্কদের মধ্যে আত্মহত্যার সংখ্যা কমে যাচ্ছে কারণ তাদের সাধারন ও সামগ্রিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে, তাছাড়া তাদের সামাজিক সাহায্য(সরকারি স্তরে), এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সম্প্রতি উন্নতি হয়েছে  বলে।

সাধারণতঃ আগে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সে আত্মহত্যা করার প্রবণতা কম ছিল, কিন্তু অনেক পাশ্চাত্যদেশে এই বিগত চল্লিশ বছরে এদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা এখন বেড়েছে।

ভারতবর্ষের কি অবস্থা?

আমাদের দেশে এখনো ঠিকমত জানা যায়নি কি রেটে আত্মহত্যা হয়। কারন বেশীরভাগ আত্মহত্যা বা অস্বাভাবিক মৃত্যু হ’লে তার যে ঠিকমত অনুসন্ধান ও রিপোর্ট  জাতিয় স্তরে প্রকাশ করা হয় কিনা জানা নেই। করা হ’লেও সেটা সাধারনের প্রচারের বাইরে থাকে।

বেশ কয়েক বছর ধরে দেখা যাচ্ছে যে ভারতের কিছু কিছু প্রদেশে যারা চাসবাস করেন তাদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়েছে। যেমন অন্ধ্রপ্রদেশ, ওড়িশায় অনেক চাষি ফসল না হওয়ার জন্য,দেনার দায়ে আত্মহত্যা করেছেন। আবার যাঁরা শেয়ারের ব্যবসা করেন, তাদের মধ্যেও শেয়ারের হঠাৎ অনেক লোকসান হওয়ার জন্য বা অর্থনৈতিক দুর্নিতিতে জড়িয়ে পড়ার জন্য কেউ কেউ অপমান,লাঞ্ছনা ইত্যাদিকে থেকে বাঁচার জন্য মৃত্যুকেই বেছে নেন।

আবার উঠতি বয়সের ছাত্রদের মধ্যেও আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়েছে। প্রায়ই শোনা যায়, পরীক্ষায় ফেল করলে, বা ঠিক মত রেজাল্ট না হ’লে, অপমানের (যেটা হয়ত বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই আত্মগ্লানি) হাত থেকে বাঁচার জন্য ঝোঁকের বসে আত্মহত্যা করে বসে।

জনস্বাস্থ্য দিকে চিন্তা করলে আত্মহত্যার ব্যপারে নিম্নলিখিত বিষয়গুলি লক্ষ্য করা যায়ঃ

)          আত্মহত্যা করার চিন্তা এবং আত্মহত্যার চেষ্টা সাধারনের মধ্যে বেশ প্রায়শই দেখা যায়।

)          বয়ঃস্বন্ধিকালে এবং যুবকদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা আগের থেকে বেশী।

)          বেকারত্ব একটা বেশ প্রধান কারণ।

)          এছাড়া আত্মহত্যার নানা উপকরণ যেমন, নানা বিষাক্ত দ্রব্য, বা ঔষধ, গাড়ি, এবং বন্দুক ইত্যাদি সহজে পাওয়া, এমনকি উচুঁ ফ্ল্যাট বাড়ি ইত্যাদি সহজে কাছে পাওয়ার জন্য।

)          আগের থেকে বেশি মদ্যপান বা ড্রাগে আসক্তি হবার জন্য।

)          মানসিক রোগ যেমন, ডিপ্রেশন, বা সিযোফ্রানিয়া ইত্যাদি ঠিক মত চিকিৎসা না হওয়ার জন্য। কারন এই দুটি মানসিক রোগের জন্য আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়ে যায়।

)          আর মাস মিডিয়া যেমন সিনেমা, টেলিভিশন, সংবাদপত্র ইত্যাদিতে আত্মহত্যার নানা পদ্ধতির প্রচার।

এর থেকেই বোঝা যায় যে কেন আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়ে চলেছে, আর এর জন্য বিশেষ শ্রেনীর মধ্যে আত্মহত্যা বেশী হচ্ছে।

কি কি কারনের জন্য আত্মহত্যার প্রবণতা হ’তে পারে?

Ø  পুরুষরা বেশী আত্মহত্যা করে, যদিও মেয়েরাই বেশী আত্মহত্যার চেষ্টা করে।

Ø  বেশী বয়স হ’লে তাঁরা বেশী ভাবে আত্মহত্যার দিকে ঝুঁকতে পারেন। শেষ কয়েক দশক ধরে দেখা যাচ্ছে যে বয়ঃসন্ধিকাল ও কম বয়েসি ছেলে মেয়েদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়েছে।

Ø  সাধারণতঃ অর্থনৈতিক অবস্থা যদি খারাপ হয় তাহ’লে সম্ভাবনা বেশী। অথবা হঠাৎ যদি অবস্থা খুব খারাপ হয়ে যায়।

Ø  যাঁরা একা থাকেন, যেমন অবিবাহিত, বা বিধবা, বা স্ত্রী মারা গেছেন, বা পরিবারের থেকে দূরে আছেন বা ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে।

Ø  যাঁরা চাষবাস করেন, রিফিউজি, ছাত্র, ইত্যাদির মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেশী। সমাজে সংখ্যা লঘু যাঁরা তারাও আত্মহত্যা করেন বেশী।

Ø  জীবনে বিশেষ কোন ঘটনা যেমন, হঠাৎ নিকট কেউ যেমন স্বামী বা স্ত্রী, বা সন্তান বা প্রেমিক ইত্যাদির মৃত্যু বা বিচ্ছেদ, হঠাৎ অনেক ক্ষতি যেমন, ব্যবসায়ে ক্ষতি হ’লে (যেমন শেয়ার বাজার পড়ার দরুন হঠাৎ অনেক লোকশান হ’লে), কিংবা ভীষণ কোন ক্রিমিনাল চার্জে অভিযুক্ত হ’লে ইত্যাদি।

Ø  কোন ধরনের সাহায্য না থাকলে, এবং সমাজে একা বাস করলে কোন মানসিক ধাক্কা সামলানোর ক্ষমতাও কমে যায়।

Ø  আর সমাজের থেকে সরে থাকলে, তাঁদের আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ে।

Ø  অনেকে রাগের মাথায় সামনে যা কিছু পায় তাই দিয়েই আত্মহত্যা করে ফেলেন। এই ধরনের মানুষেরা স্বভাবতঃই নিজেদের রাগ অভিমান নিয়ন্ত্রনে রাখতে পারেন না। তাঁরা আগেও হয়ত কয়েকবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন।

Ø  যাঁরা মদ্যপান করেন, বা ড্রাগ ব্যবাহার করেন, তাদের মধ্যেও আত্মহত্যার প্রবণতা বেশী।

Ø  কোন ধরনের কঠিন অসুখ হ’লে, যেমন ক্যান্সার, বা রোগের জন্য খুব বেশী ব্যথা বা যন্ত্রনা হ’লে কেউ কেউ তারথেকে মুক্তি পাবার জন্য আত্মহত্যার পথ বেছে নেন।

মানসিক রোগ ও আত্মহত্যা

মনে করা হয় মানসিক রোগের কারনে বেশীর ভাগ আত্মহত্যা হয়। ডিপ্রেশন বা মানসিক অবসাদই বোধহয় প্রধান কারন। প্রায় আশী শতাংশ আত্মহত্যার কারন কোন ধরনের মানসিক অসুখ বা সমস্যা। সিযোফ্রেনিয়ায় যাঁরা ভুগছেন তাদের মধ্যে প্রায় দশ শতাংশ আত্মহত্যা করেন তাঁদের জীবদ্দশায়। এছাড়া পাশ্চাত্যদেশ গুলিতে যেমন আমেরিকা ও ইউরোপের দেশগুলিতে প্রায় পনের শতাংশ আত্মহত্যা হয় যাঁরা অ্যালকোহল বা মদ্যে আসক্তি আছে। হয়ত তাঁদের মধ্যে অনেকেই ডিপ্রেশন বা অবসাদে ভুগছেন।

পারসোনালিটি  বা ব্যক্তিত্বের সমস্যা ও আত্মহত্যা

আমরা দেখি যে প্রত্যেক মানুষের এক একটা ব্যক্তিত্ব আছে। বেশীরভাগ জনই একটা সাধারন বা স্বাভাবিক ভাবে অন্যদের সাথে মেলামেশা করেন, মানিয়ে চলেন, এবং বেশীরভাগ ব্যপারে বিশেষ কোন সংঘাত বা অসুবিধা হয় না। আর কিছু জন আছেন যাঁরা কম বেশী অন্য ধরনের, প্রায়ই অন্যদের সাথে থাকতে বা মানিয়ে নিতে অসুবিধা হয়। তাঁদের অনেকেরই এই অসুবিধার জন্য মনের নানা উপসর্গ হয়। যেমন ডিপ্রেশন, উদ্বিগ্নভাব, আবেগপ্রবনতা, তারা নানা মাদকদ্রব্য বা অ্যালকোহল ব্যবহার করে।

এক ধরনের ব্যক্তিত্বের অস্বাভাবিকতা যেটাকে বলা যায়, আসামাজিক ব্যক্তিত্ব ( Antisocial personality), এই ধরনের ব্যক্তিত্বের লোকেদের অন্যদের সাথে মানিয়ে চলতে বেশ অসুবিধা হয়। তারা ঝোঁকের মাথায় কাউকে আঘাত করতে পারে, আবার ঝোঁকের মাথায় আবেগ নিয়ন্ত্রনে না রাখতে পেরে আত্মহত্যাও করে ফেলতে পারে। তাঁদের বেশীর ভাগেরই নানা বেআইনি কাজে জড়িয়ে পড়ার জন্য জেলে যেতে হয়। কিন্তু তাতেও তাঁদের শিক্ষা হয় না।

পরিবারে কেউ আত্মহত্যা করলে কি অন্যদেরও কি সম্ভাবনা বেশী থাকে?

পরিবারে কেউ যদি আত্মহত্যা করে থাকেন তবে দেখা গেছে যে অন্যদের মধ্যেও আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ে। এটা হয়ত অন্যদের মধ্যে ডিপ্রেশন বা অবসাদের জন্যও হতে পারে। কেউ যদি আগে একবার আত্মহত্যা করতে অসফল হয় তবে আবার সে ভবিষ্যতে আরো সাংঘাতিক ভাবে চেষ্টা করতে পারে। অনেকে মনে করেন, বা প্রচলিত ধারনা আছে যে, যে একবার আত্মহত্যার চেষ্টা থেকে বেঁচে যায় আর সে চেষ্টা করবে না। এটা একদম ভুল ধারনা।

কেউ যদি মরার বা আত্মহত্যার কথা বলেন তবে কি করা কর্তব্য?

যে কেউ আত্মহত্যার কথা বললে সেটা সিরিয়াস বা সাংঘাতিক মনে করে আরো জানার চেষ্টা এবং তাকে সাহায্য  দেওয়া উচিৎ।

আরো জানার জন্য নিম্নলিখিত বিষয়গুলি জানার চেষ্টা করুন।

Ø  মরে যাওয়ার বা আত্মহত্যার ভাবনা কি এই প্রথম হোল, না আগেও এ রকম মনে হয়েছে?

Ø  কি ভেবে এই আত্মহত্যার কথা মনে হচ্ছে? মনের মধ্যে কি ভাবের পরিবর্তন বা ডিপ্রেশন বা অবসাদ বোধ হচ্ছে?

Ø  কিছু বিশেষ ঘটনা কি ঘটেছে যা মনের মধ্যে বেশ আঘাত দিয়েছে?

Ø  আত্মহত্যার কথা মনে হলেই কি মনের মধ্যে উত্তেজনা বা উদ্বিগ্ন ভাব হচ্ছে? জিজ্ঞাসা করুন যে মনের মধ্যে সব সময় টেনশন, বা উদ্বিগ্নভাব হচ্ছে কি না? ঘুম ঠিকমত হচ্ছে কি না? কাজে কর্মে মন লাগছে কি না? আর সব সময় একটা দুঃখভাব আর মনে হচ্ছে যেন সব সহ্যের সীমার বাইরে চলে গেছে।

Ø  সে কি অন্য কারো সাথে (নিকট আত্মীয় বা বন্ধু ইত্যাদি) এ ব্যপারে কথা বলেছেন বা কোন মানসিক স্বাস্থ্যকর্মী (নার্স বা সাইকোলজিষ্ট, বা সমাজ কর্মী) বা ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করেছেন?

Ø  জানা দরকার সে কিছু প্ল্যান বা পরিকল্পনা করেছে কিনা? অনেকেই এটা বলতে চান না কি ভাবে আত্মহত্যা করবেন।

Ø  আগে কোন আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন কিনা? যদি করে থাকেন তবে, সেটা সম্বন্ধে জানার চেষ্টা করুন। সেটা প্ল্যান করে করা হয়েছিল কি? বেঁচে যাওয়ার পর মনে আপশোষ হয়েছিল কি?

Ø  সে কি কোন ঔষধ খায় কি না? সেই ঔষধ কি এখনো খাচ্ছেন না বন্ধ করে দিয়েছেন?

Ø  তাঁর কি কোন পরিবারের সাহায্য বা বন্ধু বান্ধব আছে কি না?

Ø  জানার চেষ্টা করুন আরো কিছু সমস্যা আছে কি না, যেমন কাজের জায়গায় কাজ নিয়ে সমস্যা, বা সম্প্রতি কেউ নিকটের মারা গেছেন বা বিচ্ছেদ হয়েছে কি না, বা অনেক টাকার লোকসান হয়েছে কি না, পরীক্ষা ইত্যাদিতে অসফল হয়েছেন কিনা, ইত্যাদি।

Ø  সে অ্যালকোহল বা মদ্যপান করেন কি না? বা অন্য কোন ড্রাগ ব্যবহার করেন কি না?

Ø  যদি আত্মহত্যা করেন তবে নিজের আত্মীয় বন্ধু বান্ধব তাঁদের মনের মধ্যে কি প্রতিক্রিয়া হবে, এবং তাঁরা যে মনে কষ্ট পাবেন সে সম্বন্ধে কিছু চিন্তা করেন কি না?

এই সব জানা সত্ত্বেও অনেক সময় আত্মহত্যার রিক্স বা সম্ভাবনা কতটা তা বোঝা যায় না। তাহলেও সাবধান হওয়া বিশেষ দরকার। চেষ্টা করা দরকার আত্মীয় বা কাছের লোককে জানানো, তাকে সব সময় চোখে চোখে রাখা, তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া যদি কোন ডিপ্রেশন বা অবসাদ ভাব হয়। 

বিচারশক্তি না থাকার জন্য কি ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে নিয়ে যেতে পারে?

এটা হয়ত অনেকে লক্ষ্য করেছেন যে কিছু কিছু মানুষ আছেন যারা নানা বিপদ জনক ভাবে জীবন যাপন করেন। যেমন তারা সংগতি থাকা সত্ত্বেও সাংঘাতিক অসুখ যেমন ডায়বেটিস, প্রেসারের রোগ বা হার্টের রোগ ইত্যাদির অসুধ খান না, যদিও জানেন যে অসুধ না খেলে রোগের বাড়াবাড়ি হবে, এমনকি অকালে মারাও যেতে পারেন।

আবার কেউ কেউ মদ খেয়ে বা মাদক দ্রব্যের ব্যবহার করে গাড়ি চালান। বা ধূমপান করার কথাই ধরা যাক না কেন। সিগারেট খেলে যে ফুসফুসে ও দেহে আরো অনেক রকমের ক্যন্সার হয়, হার্টের অসুখ হয় তা সত্ত্বেও ধূমপান চালিয়ে যাওয়ার মানে কি যে তাঁদের বিচার ক্ষমতা হয়তো ঠিক নেই? এই সব লোকজনদের কিন্তু কোন মানসিক গণ্ডগোল নেই। আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় তারা বেপরোয়া।

ভাবুন যাদের দেহের ওজন অনেক বেশী,তারাও অনেক সময় তাঁদের মনকে সংযত করে খাওয়া কমাতে পারে না। অনেকটা আবেগের মধ্যে থেকে বেশী খেয়েই চলে, তার ফলে দেহের ওজন ক্রমশঃ বেড়েই চলে। তার ফলে স্থূলতার (ওবেসিটি) জন্য নানা শারীরিক রোগ যেমন প্রেসারের রোগ, ডায়বেটিস, হার্টের রোগ, নানা জয়েন্টের রোগ বা গাঁটের ব্যথা ইত্যাদি হওয়ার জন্য আয়ু কমে যেতে পারে। এমনও হয় যে ওই সব রোগীরা ঠিকমত চিকিৎসা নিতে চায় না।  সেই জন্য বলা যেতে পারে যে তারা নিজেদেরকে ধীরে ধীরে অকাল মৃত্যুর দিকে নিয়ে যাচ্ছেন, বা ধীরে ধীরে সুইসাইড করছেন।

বার্ধক্যে মনের অবসাদ বা ডিপ্রেশন (কি ভাবে বুঝতে পারবেন?)

বার্ধক্য যে কোন মানুষের জীবনে আসবেই যদি সে অনেক দিন বাঁচে। বার্ধক্য এলেই যে নিরাশা বা হতাশা আসবে তার মানে নেই। অনেকেই বৃদ্ধ বয়সেও আনন্দে থাকেন, যদিও মনের মধ্যে মৃত্যুর ভয় ও আরো অনেক চিন্তা থাকতেই পারে। তাছাড়া বার্ধক্যে মনের নানা স্বাভাবিক পরিববর্তন হতে পারে যেমন, ধীরে ধীরে স্মৃতি শক্তি কমে যাওয়া, নানা দৈন্দিন কাজে ভুল হয়ে যাওয়া, আগে যে গতিতে বা স্বাচ্ছন্দে নূতন ধরনের কাজ করতে পারতেন তা করতে অসুবিধা, এমনকি নূতন জায়গায় গিয়ে নিজেকে ঠিকমত মানিয়ে নিতে অসুবিধা হওয়া ইত্যাদি হতে পারে। এ সব অসুবিধা থাকা সত্ত্বেও কম বেশী কারো সাহায্য নিয়েও মোটামুটি স্বাভাবিক জীবন যাপন করা সম্ভব।

এখন প্রশ্ন হোল বার্ধক্যে যদি উপরের উল্লিখিত অবস্থার থেকে অবনতি হয় তবে পরীক্ষা করে দেখা দরকার যে তাদের কি মনের অবসাদ বা ডিপ্রেশন হয়েছে? না এটা একটা স্বাভাবিক অবস্থা। এর জন্য নীচের প্রশ্নগুলি দ্বারা সেটা নির্নয় করা যেতে পারে।

ভারতীয়ের দৈনন্দিন কর্মক্ষমতার নির্ণয়ের জন্য প্রশ্নের তালিকা (EVERYDAY ABILITIES FOR INDIA)

১) কখনও কি এমন হয়েছে যে, যে খাবার খেয়ে একটু পরেই আবার খেতে চেয়েছেন?

২) তিনি কি সঠিক জায়গায় প্রস্রাব করতে পারেন?

৩) কখনো কি তিনি জামা কাপড়েই মল মূত্র ত্যাগ করে ফেলেন?

৪) তিনি কি সঠিকভাবে জামা কাপড় পরতে পারেন?

৫) তিনি কি দলবদ্ধভাবে কোন কাজে অংশগ্রহন করে সঠিকভাবে কাজ সম্পন্ন করতে পারেন?

৬) পারিবারিক কোন গুরুত্তপূর্ণ বিষয়ে যেমন, বিবাহ সংক্রান্ত ব্যপারে সঠিকভাবে তার মতামত প্রকাশ করতে পারেন?

৭) তিনি কি কোন গুরুত্তপূর্ণ কাজে অংশগ্রহন করে সেটা সম্পন্ন করতে পারেন?

৮) দোল,কালীপূজা ইত্যাদি গুরুত্তপূর্ণ উৎসবগুলো কি তিনি মনে রাখতে পারেন?

৯) যদি তাঁকে বলা হয় কোন খবর কারোকে দিতে, তিনি কি সে খবরটি মনে করে তাকে বলতে পারেন?

১০) তিনি কি সঠিকভাবে এলাকার বিভিন্ন ঘটনা যেমন বিবাহ, রাজনীতি, কোন দুর্যোগ ইত্যাদি সম্পর্কে আলোচনা করেন?

১১) কখনো কি তিনি নিজের বাড়ির রাস্তা হারিয়ে ফেলেন?

কি ভাবে কর্মক্ষমতার নির্নয় করা হয়

যদি কেউ কোনো কাজটি করতে পারেন তবে তার জন্য শূন্য ( code 0) এবং কাজটা না করতে পারলে ১(code 1 ) দেওয়া হয়, মানে তখন ধরা হয় সেই উপসর্গ বা অক্ষমতাটা আছে। যদি সব মিলিয়ে বেশী স্কোর হয় তবে ধর নিতে হবে বেশী অক্ষমতা আছে।

অক্ষমতার কারণ হিসাবে জিজ্ঞাসা করা হয় বা নির্ণয় করার চেষ্টা করা হয়। যদি দেখা যায় শারীরিক বা মানসিক দুই কারনেই হচ্ছে তাহলে তাই নথিভূক্ত করা হয়। কেউ যদি বলেন “বয়সের জন্য হচ্ছে”,তাহলে সেটার আরো জিজ্ঞাসা করে সঠিক কারণ বার করার চেষ্টা করা হয়। যদি কোনো শারীরিক কারন না পাওয়া যায় তবে ধরে নেওয়া হয় যে সেটা মানসিক কারনের জন্যই হচ্ছে।

বার্ধক্যের অবসাদ অবস্থা নির্ণয়ের জন্য প্রশ্নের তালিকা ( GERIATRIC DEPRESSION SCALE)

No                                                        প্রশ্ন হ্যাঁ না
১* আপনি কি আপনার জীবন সম্পর্কে সন্তুষ্ট?
আপনার আগ্রহ ও সখগুলি আগের থেকে কি কমে গেছে?
জীবনটা কি শূন্য বলে মনে হয়?
আপনার কি প্রায়ই একঘেয়ে লাগে?
৫* আপনি কি ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আশাবাদি?
কোন বোঝা বা চিন্তা মাথা থেকে দূর হচ্ছে না বলে মনে হয়?
নিজেকে বেশীরভাগ সময় উজ্জীবিত মনে হয়?
যে কোন সময় মন্দ কিছু ঘটতে পারে তা নিয়ে কি ভয় পান?
৯* আপনি কি বেশীরভাগ সময় আনন্দে থাকেন?
১০ নিজেকে প্রায়ই অসহায় মনে হয় কি?
১১ আপনি কি প্রায় সময় চঞ্চল ও অস্থির হয়ে পড়েন?
১২ আপনি কি ঘরে থেকে বা ঘরের বাইরে গিয়ে নতুন কিছু করতে ভাল্বাসেন?
১৩ আপনি প্রায়ই কি ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েন?
১৪ আপনার কি মনে হয় যে অন্য অনেকের চেয়ে আপনার স্মৃতিশক্তির বেশী সমস্যা হচ্ছে?
১৫* এখন কি বেঁচে থাকাটা আপনার কাছে বিস্ময়কর মনে হয়?
১৬ নিজেকে প্রায়ই অযোগ্য বলে মনে হয়?
১৭ নিজেকে কি এখন অসহায় বলে মনে হয়?
১৮ আপনি কি অতীত নিয়ে কি খুব চিন্তা করেন?
১৯* আপনি মনে করেন জীবনটা খুব আনন্দময়?
২০ কোন নুতন কাজ শুরু করতে গেলে সেটি কি এখন কঠিন বলে মনে হয়?
২১* আপনি নিজেকে কি বেশ উৎসাহি বলে মনে করেন?
২২ আপনি কি মনে করেন যে আপনার অবস্থা আশানুরূপ নয়?
২৩ আপনি কি মনে করেন যে আপনার বয়সের অন্য সকলে আপনার থেকে বেশী ভাল আছেন?

সন্তান বা ছেলেমেয়ে মানুষ করা (Parenting)

যে কোন নারী বা পুরুষের জীবনে বিবাহ একটা বিশেষ ঘটনা, এর জন্য মনে নানা প্রভাব, মানসিক চাপ ফেলতে পারে। বিবাহের সঙ্গে সঙ্গে সন্তানের সম্ভাবনা একটা বিশেষ অবস্থার সৃষ্টি করে। যদি স্বামী স্ত্রীর মধ্যে এ ব্যাপারে মতের মিল থাকে তবে কোন বিশেষ সমস্যা হবার সম্ভাবনা কম।

স্বামী ও স্ত্রীর মানসিক ও দৈহিক মিলনে যে সন্তান আসে, মানুষের ক্ষেত্রে এই শিশু সন্তান বেশ অসহায়। আমরা জানি মানব শিশুই এই জীব জগতে সব চেয়ে বেশী এবং সব চেয়ে বেশী সময় ধরে দেখা শোনার দরকার হয়। তার জন্য অনেক প্রস্তুতির দরকার হয়। আমার জানা নেই যে এর জন্য কোন ইউনিভারসিটি বা কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোন শিক্ষা ব্যাবস্থা আছে। কিন্তু কোন শিশুর মধ্যে কোন ধরনের অবহেলা বা অত্যাচার দেখা যায় তখন সেই শিশুর মা বাবাকে ছেলেমেয়ে মানুষ করার কিছু ট্রেনিং বা শিক্ষা দেওয়া হয়। সুতরাং আমরা ধরে নিই সব মা বাবাই তাদের সন্তানদের মানুষ করতে পারবে।

প্রাচীন কাল থেকেই কোন পরিবারে যদি সন্তান আসে তার দেখা শোনার জন্য পরিবারের বয়স্ক মেয়েরা বা মায়েরা এব্যপারে সব সাহায্য করেন। কিন্তু বর্তমানে একান্নবর্তি বা জয়েন্ট ফ্যামিলি না থাকার জন্য নূতন মা বাবাকেই তাদের নূতন সন্তানকেই দেখাশোনা করতে হয়।

সন্তান আসাতে পরিবারের উপর কি প্রভাব ফেলতে পারে?  

সন্তানের জন্ম হলেই তার নানা চাহিদা যেমন তাকে সব সময় দেখা শোনা করা, ঠিকমত ও ঠিক সময়ে খাওয়ানো, তার স্বাস্থ্যসম্মত ভাবে ঠিক ভাবে দেখা শোনা করা, যাতে তার বেশী ঠান্ডা বা গরম না লাগে। আর তার বয়স অনুযায়ী তার সাথে খেলা করা।

পরিবারের যদি কোন সাহায্য না থাকে, যেখানে কেবল সন্তানের মা বাবাই আছেন তাহলে তাদের সময়ের অনেকটা চলে যায় শিশুর দেখাশোনা করতে। যদি মায়েরা চাকরি করেন তাহলে তাদের চাকরি থেকে ছুটি নিতেই হয়।যদি মাতৃত্বের জন্য বেতন সহ ছুটি না পাওয়া যায় তবে সেই পরিবারে বাড়তি অর্থনৈতিক চাপ পড়ে।

সন্তান যদি শারীরিক দিক থেকে সুস্থ্য থাকে, তবে তাদের দেখা শোনা করতে সাধারণতঃ বিশেষ কোন সমস্যা হয় না। শিশুর কোন ধরনের শারীরিক রোগই মা বাবার মনে মানসিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে। চিকিৎসার খরচের জন্য বাড়তি মানসিক চাপ হয়।

প্রথম সন্তানের জন্য মা বাবার অনেক টেনশন থাকে, যদি সেটা দ্বিতীয় সন্তান হয় তবে তাকে দেখা শোনার ব্যপারে আগের অভিজ্ঞতা থাকার জন্য সেটা কিছুটা সহজ হয়। আবার অর্থনৈতিক দিক দিয়ে আবার চাপ পড়তে পারে। পরিকল্পনা করে কোন শিশুর জন্ম পরিবারে অনেক কম টেনশন বা চাপ ফেলে।

দেখা গেছে শিশুর জন্ম মা বাবার মনে তাদের ছোট বেলার নানা সমস্যার কথা মনে করিয়ে দেয়।

সাধারণতঃ দেখা গেছে যে পুরুষ মানুষেরা তাদের কাজ, বন্ধু বান্ধব, এই সব নিয়েই বেশী ব্যস্ত থাকে, সন্তান মানুষের ক্ষেত্রে তারা বিশেষ অংশ নিতে চায় না।

কি ভাবে সন্তান মানুষ করা যেতে পারে,সে সম্বন্ধে কিছু আলোচনা 

বেশীরভাগ মাতাপিতা তাদের নিজের ধারনা বা জ্ঞান ইত্যাদি থেকেই নিজের সন্তানদের নিজের মত করে মানুষ করেন। এই মানুষ করার সময় শিশুর বা সন্তানের মন বা মেজাজের উপর, এবং মা বাবার মনের উপর নির্ভর করে। মনে করা হয় বেশীর ভাগ মা বাবাই তাদের মা বাবার কাছ থেকে শিখে নেন, যদিও তাদের সবটা তারা নাও নিতে পারেন। মানুষ করার ব্যাপারে ছেলে মেয়ের শিক্ষা বা পড়াশোনা কতটা দেখাশোনা করা দরকার তা বলা শক্ত। কিন্তু আমাদের মত দেশে ছেলেমেয়েদের ক্যারিয়ার বা ভবিষ্যত গড়ার ব্যাপারে মানুষ করার সময় মাবাবা অনেক বেশী জোর দেন।

সাইকোলজিষ্ট বা মনোবিজ্ঞানীরা অনেক বছর আগে (প্রায় ১৯২০ সাল) থেকেই ভাবতে শুরু করেন কি ভাবে মাতাপিতা মানুষ করার সময় শিশুর মনে প্রভাব ফেলে।  এর জন্য অনেক স্টাডি বা নিরিক্ষনের পর জানা গেছে যে “মাবাবার মানুষ করার ষ্টাইল হয়তো অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ন”।

ডায়না বমরিন্ড় ( Diana Baumrind, 1973) লক্ষ্য করেন যে “মাবাবার মানুষ করার উপর নির্ভর করে কি ভাবে তাদের সন্তানেরা পারিপার্শিক অবস্থায় কাজে লাগিয়ে তারা তাদের লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে”। বমরিন্ড দেখেছেন যে চারটি প্রধান ব্যবহার যেটার জন্য মাবারা মানুষ করতে সফল হবার সম্ভাবনা বেশী। যেমনঃ

সংবেদনশীল বা সংবেদনশীল না হওয়া ( Responsiveness vs. Unresponsiveness)

চাহিদা আছে বা চাহিদা নেই (Demanding or Undemanding )

পরে বমরিন্ড মনে করেন যে তিন রকমের মানুষ করার স্টাইল আছেঃ Authoritative (প্রভুত্ব-ব্যঞ্জক), Authoritarian(নিরঙ্কুষভাবে )মেনে চলা, and Permissive(অনুমোদন) ভাবে.

এছাড়া আরো কয়েকটি রকম ভাবে মানুষ করা হয় যেমন, অবহেলা বা যত্নহীনভাবে,এবং  প্রশ্রয়দিয়ে। যে সব পরিবারে অবহেলা, প্রশ্রয় ও অত্যাচার বা মারধোর ইত্যাদি হয় সেই ছেলেমেয়েরা বড় হয়ে তাদের নানা মানসিক সমস্যা হয় ও সমাজিক ভাবে অনেক সমস্যা হবার সম্ভাবনা থাকে।

এটা অনেকেই মানবেন যে, মানুষ করতে গেলে শাস্তি বা মারধোর দেওয়া যেমন ভাল নয় তেমনই একেবারে উদাসীন থাকাও ঠিক নয়। সন্তানদের জন্য কিছু কিছু নিয়ম স্থির করা ও তাদেরকে মেনে চলার জন্য বলা, এবং সাথে সাথে তাদের প্রতি ভালবাসা ও সহানুভূতিশীল হওয়া।

মনে রাখা দরকার যে বেশীরভাগ ক্ষেত্রে মানুষ করার নিয়ম কোন একটা পদ্ধতি বা আদর্শ মেনে চলে না। বিভিন্ন পরিবারে ,বিভিন্ন সমাজে বা দেশে এই মানুষ করার নিয়ম বিভিন্ন রকম।

Authoritative (প্রভুত্ব-ব্যঞ্জক)

এই ধরনের মানুষ করাকে মনে করা হয় সঠিক বা আদর্শ। এতে মা বাবারা সন্তানের শারিরিক ও মানসিক সব রকমের চাহিদার প্রতি বিশেষ সজাগ থাকেন। তাঁরা সব সময় চেষ্টা করেন যাতে সন্তানেরা স্বাবলম্বী হয়, অথচ তাদের উপর কিছুটা নিয়ন্ত্রণ থাকে যতক্ষন না পর্যন্ত তারা প্রাপ্ত বয়স্কঃ হচ্ছে।ছেলে মেয়েদের জন্য তাঁরা কিছু নিয়ম বা নির্দেশ দেন যে গুলো তাদেরকে মেনে চলতে হয়, এবং সঙ্গে সঙ্গে তাদেরকে কিছুটা স্বাধীনতাও দেওয়া হয়। ছেলেমেয়েদের সাথে অনেক সময় মা বাবার অনেক আলোচনা হয় অনেক বিষয় নিয়ে, যাতে তাদের মনে ভয় বা ভুল বোঝাবুঝি না থাকে। ছেলে মেয়েদের অনেক সময় কোন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে তাদের মতামত, ও ইচ্ছা ইত্যাদি জানা হয় যাতে তারা ভবিষ্যতে সেই ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে পারে। মনে রাখতে হবে এই ধরনের মানুষ করাতে পিতামাতা বা অভিভাবকদের তাদের সন্তানদের বিষয়ে অনেক সজাগ থাকতে হবে, এবং তা মেটাতে হবে।

ভুল করলে সন্তানদের শাস্তিও দেওয়া হয়, এবং কেন তাদের শাস্তি দেওয়া হচ্ছে সেটার কারন এবং কেন দেওয়া হচ্ছে সেটা বুঝিয়ে বলা হয়। কোন ধরনের শারিরিক অত্যাচার বা মারধোর করা, বা বন্ধ ঘরে আটকে রাখা, ইত্যাদি অনেক সময় সন্তানদের মনে স্থায়ীপ্রভাব ফেলতে পারে। এমনকি দেখা গেছে যে পরে তাদের নানা মানসিক উপসর্গ যেমন, ডিপ্রেশন( বা মানসিক অবসাদ), টেনশন(বা মানসিক উদ্বিগ্নভাব),এমন কি সাইকোসিস, ও দুষ্কৃতকারী হয়ে যেতে পারে। মনে রাখা দরকার শাস্তির উদ্দেশ্য হ’ল ছেলে মেয়েদের বোঝানো যে যেটা খারাপ ব্যবহার সেটা যেন আর না করা হয়।

Authoritarian (নিরঙ্কুষভাবে )মেনে চলা

এই ধরনের মানুষ করায় ছেলে মেয়েদের কঠোরভাবে নিয়ম মেনে চলতে হয়, কোন ব্যপারে কোন প্রশ্ন করা যাবে না। অনেকটা মিলিটারি স্টাইলের মানুষ করা। একটু ভুল হলেই শাস্তি পেতেই হবে, তারজন্য কোন ধরনের বোঝাবুঝির বা ব্যখ্যার দেওয়ার প্রয়োজন নেই। এই ধরনের মানুষ করায় ছেলেমেয়েদের সাথে মা বাবা বা অভিভাবকদের কোন বিষয়ে আলোচনা হয় না। সন্তানরাও সাধারণতঃ কোন প্রশ্ন তুললে তার সম্বন্ধে কোন উত্তর দেওয়া হয় না। মা বাবারা সন্তানদের মানসিক ও শারিরিক প্রয়োজনের দিকটায় বিশেষ নজর দেন না।

বড় হয়ে এই ধরনের ছেলে মেয়েরা ঠিক স্বাবলম্বী হতে পারে না। তাদের সমাজের সাথে মিশতে কিছু কিছু অসুবিধা হতে পারে। আবার এটাও দেখা গেচ্ছে যে, প্রাচ্যের দেশ গুলি যেমন ভারত, চীন, জাপান ইত্যাদি দেশে এই ধরনের মানুষ করার পদ্ধতিতে অনেক সফলতা হয়েছে। এমনকি পাশ্চাত্য দেশে থেকেও ভারতীয়, ও অন্যান্য এশীয় দেশের মাবাবারা তাদের সন্তানদের সেই সনাতন পদ্ধতিতে মানুষ করেন, যদিও তারমধ্যে অল্পকিছু পরিবর্তন আজকাল লক্ষ্য করা যায়।

মনে রাখা দরকার যদি নিয়ম পালন অতি কঠোর হয়, অত্যাচারের পর্যায়ে চলে যায় তাহ’লে সন্তানেরা মা বাবার থেকে মানসিক ভাবে দূরে চলে যায়,যখন একটু বড় হয় তখন তারা বাড়িছেড়ে পালিয়ে যেতে পারে। সেই ক্ষেত্রে তারা নানা খারাপ সংসর্গে পড়ে যেতে পারে।

Permissive (অনুমোদন) ভাবে মানুষ করা

এই ধরনের মানুষ করাকে এক কথায় বলা যায় প্রশ্রয়দিয়ে মানুষ করা। মা বাবারা সন্তানদের সব কিছুর ব্যাপারে ভীষন সতর্ক থাকেন,কিন্তু সন্তানদের নিয়ন্ত্রণ করার ব্যপারে কিছু ভাবেন না। সন্তানরা যা চায় তাই পায়, তাদের স্বভাবকে কোন ভাবে নিয়ম দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা হয় না। এক কথায় বলা যায় এই ধরনের মানুষ করার ফলে ছেলে মেয়েরা সাধারণতঃ খুব আবেগপ্রবন হয়। বয়ঃসন্ধিকালে নানা রকম খারাপ ব্যবহার, বা অসামাজিক কাজ কর্ম, এমনকি ড্রাগের আসক্তি হতে পারে। তারা তাদের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, সব সময় তারা ধরে নেয় তারা সবকিছু থেকে পার পেয়ে যাবে। অবশ্য যদি কেউ ভাল ভাবে বেড়ে ওঠে তবে সে স্বাবলম্বী হতে পারে, কোন কিছু হার স্বীকার করে নিতে শেখে, আর তার শেখার আগ্রহ থাকবে।

অবহেলা দিয়ে মানুষ করা(Neglectful parenting)

এক্ষেত্রে মা বাবারা সন্তানদের ব্যপারে উদাসীন থাকে। সন্তানদের কোনধরনের প্রয়োজনিয়তা, বা তাদের কোন কিছুর ব্যপারে তারা খোঁজ নেয় না, তারা মানসিক দিয়েও সন্তানদের থেকে দূরে থাকেন। সন্তানদের কোন অসুবিধা বা চাহিদা থাকে সেটা সম্বন্ধে উদাসীন থাকেন, যদিও তাদের খাওয়া থাকা ও অন্যান্য জরুরী জিনিষগুলো ব্যবস্থা করা হয়।

এই ধরনের অবহেলা হয় যদি পরিবারে মানসিক,সামাজিক কোন সমস্যা থাকে, বা মা বাবা দুজনেই যদি উপার্জনের জন্য ব্যস্ত থাকেন,এবং মানুষ করা তাদের কাছে একটা বাড়তি কাজ মনে হয় এবং পরিবারে আর কেউ না থাকে যে ছেলেমেয়েদের দেখা শোনা করতে পারে। মা বাবার মধ্যে মাদক দ্রব্যে আসক্তি ও তাদের মধ্যে যদি মানসিক অসুস্থতা থাকে তাহলেও এই ধরনের অবহেলা হ’তে পারে।

এই অবহেলার জন্য সন্তানের মধ্যে একটা একাকীত্ব ভাব আসতে পারে। কেউ কেউ আবার বাড়িথেকে পালিয়ে যেতে পারে, লেখা পড়া বন্ধ করে দিতে পারে, খারাপ সংসর্গে পড়ে অসামাজিক কাজে জড়িয়ে পড়তে পারে। অনাথ আশ্রমে এই ধরনের মানুষ করা দেখা যায়।

মানুষ করার ব্যপারে ধর্মের প্রভাব

অনেক পাশ্চাত্যদেশে, ও প্রাচ্যের দেশেও নানা ধার্মিক মতের গোষ্ঠিরা তাদের সন্তানদের ধার্মিক নিয়ম অনুসারে মানুষ করেন। বেশীরভাগ ক্ষেত্রে ছেলে মেয়েদের আলাদা ভাবে মানুষ করা হয়। ছেলে দের ক্ষেত্রে এবং মেয়ে দের জন্য বিভিন্ন নিয়ম মানা হয়। সাধারণতঃ তাদের বাইরের সাথে সম্পর্ক বা মেলা মেশা করতে দেওয়া হয় না। অভিভাবক বা পিতা মাতার কঠোর নিয়ন্ত্রনে রাখা হয়, এই ধরনের বন্ধ সমাজে মানুষ হয়ে তারা যখন তাদের সমাজের বাইরে বেরোয় তখন তাদের মানিয়ে নিতে খুবই অসুবিধা হয়। তাদের দৈনন্দিন জীবন যাপন ধার্মিক নিয়ম অনুসারে চলতে থাকে, নিয়ম ভাঙ্গলে তাদেরকে সমাজের থেকে তিরস্কার পায়, আবার প্রায়শ্চিত্ত করতে হতে পারে।

এই ধরনের মানুষ করা কে কি আদর্শ বলা যায়? এই নিয়ে মতভেদ আছে।

মানুষ করার ব্যপারে নীচের বিষয় গুলো গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে

Ø  সন্তান মানুষ করার কোন বিশেষ নিয়ম বা পদ্ধতি নেই। কোন মানুষ করার স্টাইল একেবারে ভুল, আর কোনটা একেবারে ঠিক এটা হতে পারে না।

Ø  মা বাবা বা অভিভাবকেরাই ঠিক করেন কি ভাবে তাদের সন্তানদের মানুষ করবেন।কেউ কেউ পালা করে দেখা শোনা করেন ,কেউ কেউ এটাকে  প্রধান কাজ বলে মনে করেন।

Ø  মানুষ করার ব্যপারে মা বাবারা কি ভাবে মানুষ হয়েছেন তার উপর অনেক সময় নির্ভর করে। কেউ যদি খুব কড়া নিয়মের মধ্যে মানুষ হয়েছেন,এবং তাতে যদি সাফল্য এসেছে,সেক্ষেত্রে তারাও সেই ভাবে তাদের সন্তানদের মানুষ করতে পারেন।

Ø  অনেক পরিসংখ্যান নিয়ে দেখা গেছে যে মারধোর দিলে, বা খুব বেশী শাস্তি দিলে ছেলে মেয়েদের মনে ভবিষ্যতে প্রভাব ফেলে, এবং তাদের নানা মানসিক উপসর্গ,যেমন ডিপ্রেশন বা অবসাদ, টেনশন বা উদ্বিগ্নভাব,এমনকি সাইকোসিস,ও  হতে পারে।

Ø  যে পরিবারে সব সময় ঝগড়া ঝাটি হয়, একে অপরকে শুধু দোষারোপ করে, এবং আবেগপ্রবন হয়, সেই আবহাওয়ায় মানুষ হলে, তাদের ভবিষ্যতে নানা মানসিক সমস্যা হতে পারে।

Ø  মা বাবার মধ্যে কারো যদি ড্রাগ বা মদে আসক্তি থাকে, তবে সেই আসক্তি সন্তানদের মধ্যেও হতে পারে। সে ক্ষেত্রে মা যদি মদ্যপ হয় তার ছেলে মেয়েদের মদ্যপ বা মাদকাসক্তি হবার সম্ভাবনা সব চেয়ে বেশী।

Ø  অনেক সমাজে ছেলেমেয়েরা প্রাপ্ত বয়ঃস্ক হয়ে যাওয়ার পরও মা বাবারা তাদের নিয়ন্ত্রণ ছাড়তে চান না। যে কোন সমস্যা হলেই তাঁরা ছেলে মেয়েদের সাহায্য করতে ছূটে যান। এ ব্যপারে তাদের সন্তানরা চাইলেই তাদের সাহায্য করা উচিৎ। যখন তখন ছেলের বা মেয়ের ফ্যামিলি বা পরিবারের ব্যপারে অনাবশ্যক ভাবে নাক গলালে তাতে সেই পরিবারের মানসিক শান্তি নষ্ট হতে পারে, এমনকি সেই ফ্যামিলি ভেঙ্গে যেতে পারে।

Ø  মনে রাখা দরকার অবহেলা দিয়ে মানুষ করলে, মা বাবারা পরে অবহেলাই পাবেন। 

মানুষ করার ব্যপারে আরো কিছু জরুরী তথ্য

মা বাবার মানসিক স্বাস্থ্যঃ

মানুষ করার ব্যপারে বিশেষ করে মায়ের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর অনেক কিছু নির্ভর করে। মা যদি উদ্বিগ্নতা বা টেনশনে ভোগে তাহ’লে ছেলে মেয়েদের মধ্যে এটা পরে দেখা যেতে পারে। কারন বেশীরভাগ ক্ষেত্রে সন্তানরা সেটা মা বা বাবার কাছ থেকেই শেখে। আবার মায়ের অবসাদ বা ডিপ্রেশন থাকলে সেক্ষত্রে সন্তানদের অবহেলা হতে পারে।অবশ্য বাড়িতে যদি বাবা মা’র মধ্যে একজন যদি ঠিক থাকেন তবে ছেলে মেয়েদের মধ্যে প্রভাব অতটা নাও ফেলতে পারে। এছাড়া একজনের মধ্যে সিযোফ্রেনিয়া বা কোন ধরনের সাইকোসিস থাকলে, ফ্যামিলিতে আর কেউ দেখাশোনার করার না থাকলে সেই ছেলেমেয়েদের অভিভাবকের কোন নিয়ন্ত্র বা গাইডেন্স না থাকার জন্য, অনেকটা অবহেলায় তারা বড় হয়ে ওঠে। এই ভাবে বড় হ’লে তাদের মধ্যে অনেক সময় নানা অসামাজিক ব্যবহার দেখা যায়, যেমন মিথ্যা কথা বলা, চুরি করা, মারা মারি করা, বাড়িথেকে পালিয়ে যাওয়া, পড়াশোনা বন্ধ করে দেওয়া, মদ ও মাদকদ্রব্যে আসক্তি, ইত্যাদি।

লেখা পড়া ও ভবিষ্যতের চিন্তা

এব্যপারে প্রাচ্যদেশগুলি বা এশিয়ার দেশগুলিতে অনেক ভাবা হয়। মা বাবারা সব সময় চেষ্টা করেন তাঁদের ছেলেমেয়েরা যাতে অনেক শিক্ষা পায়, মানে যেমন ইঞ্জিনিয়ার,ডাক্তার,বা এখন সম্প্রতি হয়েছে আই টি বা অথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষা নেয় বা ম্যানেজমেন্ট পড়ে অনেক বড় চাকরি করে। এর প্রধান উদ্দেশ্য হ’ল পরিবারের রোজগার বাড়ানো,এবং মান ও অবস্থার উন্নতি করা।

তারজন্য মা বাবারা পড়াশোনার উপর খুব বেশী চাপ দেন। অনেক সময় সন্তানদের সেই মানসিক বুদ্ধি বা ক্ষমতা না থাকলেও তাদের মধ্যে এই উচ্চাশা জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়।তাঁরা যেটা করতে পারেন নি সেটা তাঁরা সন্তানদের মধ্যে দেখতে চান।

এর ফলে পরীক্ষায় ফেল করলে বা জয়েন্টে ভাল ফল না করতে পারলে সন্তানদের মনে ও পরিবারের সবার মনে গভীর হতাশাঁ, বা নিরাশা ও দুঃখ হয়।এর ফলে কেউ কেউ ঝোঁকের বশে আত্মহত্যা করে ফেলে।

এই জন্য মাতাপিতা বা শিক্ষকদের উচিৎ সন্তানদের মনে অহেতুক আশা বা আকাঙ্খা না জাগিয়ে তোলা,এবং সামর্থ্য অনুযায়ী তাদের ভবিষষ্যতের জন্য প্রস্তুত করা।

পড়াশোনায় হঠাৎ অবনতি হ’লে অভিভাবকের উচিৎ সেটা বোঝার চেষ্টা করা। এই অবনতির কিছু কারণ হোলঃ ছাত্রের মনে যদি টেনশন, অবসাদ বা হতাশা আসে, বা ছটফটে ভাব থাকে তবে পরীক্ষায় ফল খারাপ হতে পারে। এছাড়া বয়ঃসন্ধিকালে হঠাৎ শুরু হতে পারে, সিজোফ্রেনিয়া তার উপসর্গ হোল যেমন, পড়াশোনায় হঠাৎ অবন্তি,খুব একা থাকা নিজের মনে খুব চিন্তা করা, এমনকি নিজের মনে কথা বলা বা হাসা ইত্যাদি।

আর যদি প্রথম থকেই সহজ পড়া না বুঝতে পারে,বা সহজ কাজ না করতে পারে,তাহ’লে বুঝতে হবে মাথায় বুদ্ধিই নেই। তারজন্য বিশেষ ধরনের স্কুলে শিক্ষা নিতে হবে।

মা বাবার উচিৎ ছেলেমেয়েদের সাথে মাঝে মাঝে তাদের ভবিষ্যতের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করা। যদিও অনেকেই সেই  ভবিষ্যতের প্ল্যান পাল্টাতে পারে।

কি খাওয়া দাওয়া করবে?

বাড়ন্ত ছেলে মেয়েদের ঠিক মত বা সুষম খাদ্য দেওয়া উচিৎ।সুষম খাদ্য মানেই যে একগাদা মাছ মাংস বা ডিম খেতে হবে তা নয়। অনেক বা কম পক্ষে পর্যাপ্ত পরিমানে শাকসবজি, কিছু ফল এবং মাছ বা মাংস যেন প্রায়দিনই দেওয়া হয়। যেহেতু কম বয়সে অনেক শারিরিক পরিশ্রম বা খেলেধুলা করা হয়,তারজন্য কার্ব হাইড্রেড জাতিয় খাদ্য বেশী করে দিতে হবে। বেশীরভাগ ছেলেমেয়েদের নানা মুখরোচক ফাষ্ট ফুড ও পানীয় যেমন, আলুর চিপস, বার্গার ইত্যাদি বা নানা হাই এনার্জি পানীয় যেমন কোক, পেপ্সি,লিমকা  খাবার প্রবণতা থাকে। এইগুলি বিশেষভাবে কন্ট্রোল করা দরকার, কারন এতে অস্বাভাবিক দেহের ওজন বৃদ্ধি হতে পারে।

অনেক মা বাবা মনে করেন ভিটামিন টনিকে শারিরিক শক্তি বা বুদ্ধি ও পড়াশোনায় মনোযোগ ইত্যাদির বৃদ্ধি করে। এটা একদম ভুল ধারনা। এখনো পর্য্যন্ত বুদ্ধি বাড়ানোর জন্য কোন ঔষধ বা টনিক আবিষ্কার হয়নি।

কোন ধরনের টেনশন, বা অবসাদ হ’লে ,এমনকি পরীক্ষার সময় বেশীর ভাগ ছেলে মেয়েরাই টেনশনের জন্য তাদের খাওয়া কমে যেতে পারে। তখন যা করে হোক,এমনকি জোর করে কিছু পরিমাণে খেলে, একটু শারিরিক ব্যায়াম করলে টেনশন কমে যাবে এবং খাওয়া দাওয়া স্বাভাবিক হবে।

উঠতি বয়সে “খাওয়ার রোগ” (Eating disorder) হতে পারে, যদিও সেটা পাশ্চাত্য দেশেই বেশী দেখা যায়। যেমন কেউ অত্যধিক বেশী খেয়ে, কোন শারিরিক এ্যাক্টিভিটি বা ব্যয়াম না করে দেহের ওজন অনেক বেড়ে মোটা হয়ে যায়। তারফলে তাদের ডিপ্রেশন হতে পারে। আবার কেউ কেউ এমন কম খায়, বা অনেক খাওয়ার পর গলায় আঙ্গুল দিয়ে বমি করে সব বার করে দেয়, এর ফলে তাদের দেহের ওজন অনেক কমে গিয়ে একদম অস্থিচর্মসার হয়ে যেতে পারে। এই ধরনের অবস্থাকে “অ্যানোরেক্সিয়া নারভোসা” (Anorexia Nervosa) বলে। এই ধরনের অপুষ্টিজনিত অবস্থা প্রাচ্যের দেশ বা এশিয়ার দেশগুলিতে বিশেষ দেখা যায় না। পাশ্চাত্যদেশে উঠতি বয়সের মেয়েদের মধ্যেই বেশী হয়।

ড্রাগ ও অ্যালকোহল এর ব্যবহার

এই সম্বন্ধে প্রায় সব সমাজেই একমত যে অপ্রাপ্ত বয়ঃস্কদের কোন ধরনের ড্রাগ বা মদ্যপান করা উচিৎ না। কিন্তু যে সব পরিবারে মা বাবারা, বা অন্যান্য প্রাপ্ত বয়স্করা ড্রিংক করেন বা মদ্য পান করেন, বা সিগারেট খান তাদের ছেলেমেয়েরা একটু বড় হলেই বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে অনেক কম বয়সেই সেই সব ব্যবহার করা শুরু করে। যদিও আজকাল সিগারেট খাওয়ার সম্বন্ধে অনেক বাধানিষেধ আছে, মদ্যপান সম্বন্ধে আমাদের সমাজের যে একটা বাধানিষেধ ছিল সেটা যেন ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। মনে রাখতে হবে অ্যালকোহল একটি মাদক দ্রব্য, এটা সব সময় শরীরের ক্ষতি করে, (যদিও অনেকে মনে করেন সীমিত পরিমাণে মদ্যপান হার্টের রোগ কম হয়), এটা সাময়িক ভাবে মনের টেনশন কমিয়ে দিলেও, পরে মনের মধ্যে অবসাদ বা ডিপ্রেশন করে। গাড়ির দুর্ঘটনার একটা প্রধান কারন হ’ল মদখেয়ে গাড়িচালান।

কি ধরনের পোষাক পরবে বা সাজগোজ করবে?

এই নিয়ে পরিবার অনেক ঝামেলা হতে পারে, বিশেষ করে বয়ঃসন্ধিকালের ছেলেমেয়েদের ক্ষেত্রে। ছেলে মেয়েরা কি ধরনের পোষাক পরে সেটা নির্ভর করে অনেক সময় মা বাবার উপর,পারিপারর্শিক অবস্থা উপর। রক্ষনশীল সমাজে অনেক বাধানিষেধ থাকার জন্য ছেলে মেয়েরা যদি অন্যদের মতো হবার চেষ্টা করে তবে তা নিয়ে পরিবারে অশান্তি হতে পারে।

অনেক সময় পোষাক দিয়ে বোঝা যায় পারসোনালিটি স্টাইল কেমন। যারা খুব উগ্র জমকালো পোষাক পরে, তবে তাদের মধ্যে অন্যদের অ্যাটেনশন বা আকর্শণ করার প্রবণতা থাকে, তারা সংবেদনশীল হয়, একটুতেই মনে উত্তেজনা বা আঘাত লাগে,সব সময় তারা পার্টি বা সামাজিক অনুষ্ঠানে নিজেদেরকে সেন্টারে ভাবতে থাকে বা চায়।

এটাও দেখা যে যৌন উত্তেজক ভাবে সাজগোজ করলে সমাজে দুষ্কৃতকারি বা বাজে লোকজন নানাভাবে উত্তক্ত করতে পারে, তারজন্য নানা বিপদের সম্ভাবনা থাকে।

হঠাৎ কেউ যদি তার সাধারন পোষাক না পরে, উগ্র বা ঝকমকে পোষাক পরে, তবে এটা একটা অস্বাভাবিক মানসিক পরিবর্তনের জন্যোও হতে পারে। যেমন আবার বিপরীত অবস্থাও হতে পারে। নোংরা জামা কাপড় পরছে,ঠিক মত স্নান ও পরিষ্কার না করার জন্যগায়ে গন্ধ বেরচ্ছে এটাও একটা অস্বাভাবিক অবস্থা।

কখন যৌন শিক্ষা দেবেন

এ ব্যপারে নানা মতভেদ আছে। রক্ষনশীল সমাজে বা দেশগুলিতে মনে করা হয় অপ্রাপ্তবয়ঃস্কদের যৌনশিক্ষা দেওয়ার প্রয়োজন নেই কারন তারা মানসিক ভাবে প্রস্তুত নয়। যদিও এখনো অনেক সমাজে অপ্রাপ্তবয়সে ছেলে মেয়েদের বিবাহ দেওয়া হয়। আরো মনে করা হয় যদি যৌন শিক্ষা দেওয়া হয় তাহ’লে অপ্রাপ্তবয়সেই ছেলে মেয়েরা অবাধ যৌন ক্রিয়া করবে, তাতে সমাজের নৈতিক ভাবে অবনতি হবে।

পাশ্চাত্যদেশ গুলিতে মনে করা হয় ছেলে মেয়েদের আগে থেকে যৌন জ্ঞান না দিলে,তারা কৌতূহল এর জন্য নানা বাজে জায়গা থেকে যেমন সেক্স ম্যাগাজিন,বা ইন্টারনেট ইত্যাদি থেকে নানা অজ্ঞানের শিকার হবে। যৌন জ্ঞান থাকলে, তারা সাবধানতা নিলে  অন্তঃসত্তা হয়ে পড়বে না, কোন ধরনের যৌণ ব্যধি হবে না। পাশ্চাত্যদেশে অবিবাহিত মায়েদের মেনে নেওয়ার প্রবণতা অনেক বেশী, সেক্ষত্রে প্রাচ্যের দেশ গুলিতে কুমারী মায়ের সমাজে বাস করা বেশ কঠিন।

মানসিক আঘাতজনিত উদ্বিগ্নতা (Posttraumatic Stress Disorder) or PTSD

PTSD র বাংলায় কোন প্রতিশব্দ নেই। এর তর্জমা করা বেশ কঠিন। আমার মনে হয় “মানসিক আঘাতজনিত উদ্বিগ্ন ভাব”  হয়ত কিছুটা কাছাকাছি হতে পারে।

যে কোন মানসিক বা শারীরিক আঘাতের পরে কারো কারো মনে নানা উপসর্গ হতে পারে। সেই অবস্থাকেই বলা হয় পি টি এস ডি। এই ব্যপারে আমার একটা উদাহরণ মনে পড়ছে, “ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পায়”। সেই রকম হয় এই অবস্থাতেও। কেউ যদি একটা গাড়ির দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে যান তবে তার গাড়িতে উঠলে ভয় হতে পারে। গাড়িতে উঠলেই ভয়,বুক ধড়ফড় করা, মাথাঘোরা, মনে হতে পারে যেন সেই দুর্ঘটনাটা আবার যেন হচ্ছে। সেই সময় তার আশেপাশে কি হচ্ছে তার জ্ঞান থাকেনা। কেউ কেউ দুর্ঘটনার পর আর গাড়িতেই উঠতে পারে না। এমনকি ঐ ধরনের ঘটনা দেখলে বা শুনলে মনের মধ্যে ভয়,উত্তেজনা, এবং সাংঘাতিক একটা উদ্দিগ্নতা ভাব হয়।

এই ধরনের মানসিক আঘাত অনেক ঘটনাতেই হতে পারে। যেমন, কেউ যদি দৈহিক ভাবে অত্যাচারিত হয়, বা যৌন অত্যাচার বা ধর্ষন (রেপ), বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন বন্যা, ভূমিকম্প জন্য পরিবার ও সম্পত্তির ক্ষতি হয়। তাছাড়া উদ্বাস্তু অবস্থা, যেটা আমাদের দেশ বিভাগের জন্য হয়েছিল।সেই সময় অনেকের আত্মীয় স্বজন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার জন্য মারা গেছেন,যারা বেঁচে গেছেন তাদের সারা জীবন সেই আতঙ্ক মনের মধ্যে রয়ে গেছে। যখনই সেই দাঙ্গার কথা হয়, বা কোথাও সেই ধরনের ঘটনা ঘটে তখন তাদের মনে সেই পুরানো আতঙ্ক বার বার ফিরে আসে।

পি টি এস ডি র নাম করন এবং এর শ্রেনীবিভাগ

বিশেষজ্ঞরা অনেক বছর ধরেই লক্ষ্য করেছেন যে দুর্ঘটনা বা মানসিক আঘাতে মনের মধ্যে অনেক প্রভাব ফেলতে পারে। মানসিক আঘাতের পর এই ধরনের উদ্বিগ্নভাব বা অবস্থা জ্যাকব ডি কস্টা (Jacob DeCosta) ১৮৭১ সালে প্রথম বর্ননা করেন আমেরিকান গৃহ যুদ্ধের সেনাদের মধ্যে। তখন মনে করা হয়েছিল যে, সেই সব সৈনিকদের “হার্টের উত্তেজনা” বা হার্টের দুর্বলতা । প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় সেই একই ধরনের উপসর্গ হতে লাগল, তখন মনে করা হোত বোমার জন্য ব্রেনের ক্ষতি হবার জন্য। সেই রকম উপসর্গ আবার পাওয়া গেল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সৈনিকদের মধ্যেও, পাওয়া গেল নাৎসি কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের বন্দিদের মধ্যেও। তারপর আরো নানা যুদ্ধের ফেরত সৈনিক যেমন ভিয়েতনাম যুদ্ধের ফেরত সৈনিকদের মধ্যে,এবং সম্প্রতি ইরাক,আফগানিস্থানের ফেরত সেনাদের মধ্যেও।

কিন্তু পি টি এস ডি ডায়গনোসিসের কথা প্রথম ভাবা হোল ১৯৮০ সালের শেষদিকে।এই নামটা প্রথমে দেয় আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েস্যান, তার পর ধীরে ধীরে সারা বিশ্বে এই ডায়াগনোসিসটা বিশেষজ্ঞরা মেনে নিলেন। বর্তমানে এই ডায়াগনোসিসের রোগীদের যেমন অনেক চিকিৎসা পদ্ধতি বেরিয়েছে, তেমন এই ডায়াগনোসিসটার অনেক অপব্যবহারও হচ্ছে। সে সম্বন্ধে পরে আলোচনা করব।

অনেক আগে মনে করা হোত যারা আগেথেকেই মানসিক দিক দিয়ে দুর্বল বা সংবেদনশীল তারাই হয়ত এই ধরনের মানসিক আঘাতের শিকার হয়। পরে লক্ষ্য করা গেল যে এমনকি যারা মানসিক দিক দিয়ে বেশ সুস্থ্য ও সবল, তাদেরও যুদ্ধের থেকে ফেরত আসার পর নানা মানসিক উপসর্গ দেখা গেল।

কি ধরনের মানসিক আঘাত মনের উপর প্রভাব ফেলতে পারে?

আমাদের দৈনন্দিন জীবনে নানা মানসিক আঘাতের ঘটনা ঘটে,যেমন হঠাৎ চাকরি চলে যাওয়া, বা কেউ পরীক্ষায় ফেল করে গেল, বা হঠাৎ স্বামী স্ত্রীর মধ্যে ছাড়াছাড়ি হোল, বা কারো অনেক সম্পত্তির খোয়া গেল ইত্যাদি। কিন্তু এই সব মানসিক আঘাতেও মনের মধ্যে প্রভাব ফেলতে পারে। সমীক্ষা করে দেখা গেছে যে, এই ধরনের মানসিক আঘাতে এক হাজারের মধ্যে মাত্র চার জনের আঘাতজনিত উদ্দিগ্নভাব হয়েছে।

সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে, মানসিক আঘাতের পরিমাণটা অনেক বেশী হলে তবে মনের মধ্যে প্রভাব ফেলে, যদিও ওই পরিমাণটার সঠিক মাত্রা কি সেটা মাপা বেশ কঠিন, আর সেই মাত্রাটাও আবার নানা জনের ক্ষেত্রে নানা রকম। সেই জন্য বলা হয় মানসিক আঘাতের পরিমাণটা এমন হবে যেটা বেশীরভাগ মানুষের ক্ষেত্রেই অসহনীয় বা সহ্যের বাইরে।

এই ধরনের মানসিক আঘাত হতে পারে ভীষণ যে কোন দুর্ঘটনা যাতে প্রান যাওয়ার আশঙ্কা ছিল, বা এক চুলের জন্য বেঁচে গেছেন, বা ওই ধরনের সাংঘাতিক ঘটনা নিজের চোখে কেউ দেখেছে।

যৌন অত্যাচার বা রেপ(বলাৎকার),শারীরিক অত্যাচার যাতে প্রান যাওয়ার আশঙ্কা থাকে ইত্যাদি অবস্থাতেও মানসিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে।

যুদ্ধের সময় বন্দির উপর অত্যাচার, বা অন্য বন্দিদের অত্যাচার দেখা বা তাদেরকে মেরে ফেলা ইত্যাদি দেখাও মনের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে।

এই ধরনের মানসিক আঘাতের কি কি উপসর্গ হতে পারে ?

সব চেয়ে প্রধান উপসর্গ হোল, প্রথম আঘাতের সময় যে অবস্থা হয়েছিল মনে হবে সেটা যেন আবার হচ্ছে। যতই চেষ্টা করা হোক না কেন সেই অবস্থাটা যেন ফিরে ফিরে আসতে থাকে। কোন ধরনের ইঙ্গিতে বা কিছুর দ্বারা ওই অবস্থাকে মনে করিয়ে দিলে সেই অতীত ঘটনার আবার মনে ফিরে আসে,একে বলা হয় ফ্ল্যাশব্যাক, অনেকটা সিনেমার ফ্ল্যাশব্যাকের মত।

সেই ঘটনার কথা যখনই মনে হয়, তখন মনের মধ্যে অস্বাভাবিক কষ্ট বা অসুবিধা হয়। মনে পড়ার সাথে সাথে, ভয় হতে পারে। বুক ধড় ফড় করা, শরীরের মধ্যে উত্তেজনা,ঘাম হওয়া,মাথা ঝিম ঝিক করা, আশে পাশে কি হচ্ছে তার কোন হুশ থাকে না। সেই সময় সে সেই অবস্থা থেকে মুক্তি পাবার জন্য অন্য জায়গায় চলে যেতে চায়।

মনের মধ্যে সব সময় সেই ঘটনার কথা মনে হতে থাকে।কিছুতেই সেই ঘটনার কথা ভুলতে পারে না। এমনকি সেই ঘটনা মনের মধ্যে অনেকটা ছবির মতো স্পষ্ট করে থেকে থেকে ফুটে ওঠে। যেমন, কেউ গাড়ীর দুর্ঘটনার আওয়াজ রাতে শুনতে থাকে কারন সেই দুর্ঘটনাটা রাতে হয়েছিল বলে। একজন আফগানি উদ্বাস্তু রাতে ঘুমাতে পারতো না,কারন রাতে সে জোরে রকেটের আওয়াজ শুনতো। কাবুলে তাদের বাড়িতে রাতে তালিবানের ছোড়া রকেট পড়ার জন্য ধ্বংস হয়ে যায়। তার ভাই, মা, বাবা,আরো আত্মীয়স্বজন মারা যায়।সে সেই সময় বাড়িতে ছিল না বলে সেই একমাত্র বেঁচে যায়।

রাত্রে ঘুমের মধ্যে নানা খারাপ ও ভয়ঙ্কর স্বপ্ন হতে থাকে। স্বপ্নগুলো খুব স্পষ্ট মনে হয়, স্বপ্নগুলো অনেক ভয়ের হয়। অনেক সময় ঘুমতেই ভয় লাগতে পারে। সেইজন্য কেউ কেউ সারা রাত জেগে থাকে, কারন চোখ বুজলেই মনে হয় সেই আতঙ্কজনক ঘটনা গুলো শুরু হচ্ছে বা শুরু হবে। ঘুমের থেকে ভীষণ ভয় খেয়ে জেগে উঠতে পারে। সেই সময় বুক ধড় ফড় করে, ঘামে সারা গা ভিজে যেতে পারে, বেশ ভয় লাগতে পারে। কেউ কেউ ঘুমের মধ্যে চিৎকার, বা নানা কথা বলতে পারে। কেউ যদি সেই সময় তাকে ডাকে বা গায়ে হাত দিয়ে জাগানোর চেষ্টা করে তবে সে বুঝতে পারে না। জাগলেও বুঝতে পারে না কোথায় আছে।স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে বেশ কয়েক মিনিট লাগতে পারে। অস্বাভাবিক অবস্থার সময় সে মারমুখী হতে পারে। স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসার পরে আগের অবস্থার কথা সে মনে নাও করতে পারে।  এই ধরনের স্বপ্নকে বলা হয়, Nightmare বা ঘুমের মধ্যে আতঙ্ক।

অনেকে যে ঘটনার জন্য মানসিক আঘাত হয়েছে সেটা সে ভুলতে চেষ্টা করে। আবার কেউ কেউ মনের মধ্যে সব সময় সেই ঘটনাটা নানা প্রশ্ন হতে থাকে। ভাবতে থাকে কেন এমন হ’ল, কি করলে সেটা না হ’তে পারতো, নিজেকে অনেক সময় দোষ দিতে থাকে। কখনো কখনো মনের মধ্যে খুব ভাবতে থাকে কি ভাবে প্রতিশোধ নেবে। এই ভাবে চলতে থাকার জন্য কখনোই সেই ঘটনাকে মনের মধ্যে মেনে নিয়ে,যা হবার হয়েছে এই ভেবে স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারে না।

তাদের মধ্যে নানা ভাবের পরিবর্তন হয়, যেমন, অত্যধিক ভয়, বা রাগ,দুঃখ, অনুশোচনা, এবং মনে করে যে তারা অনেক খারাপ কাজ করেছে। আবার মনে হতে পারে যে মনে কোন অনুভুতিই নেই।

অনেকে এই সব অসুবিধার জন্য অ্যালকোহল বা মদ খেতে শুরু করে। মদ খেলে সাময়িক ভাবে মনের মধ্যে উদ্বিগ্ন ভাব, ভাল না লাগা, বা ঘুমের অসুবিধা ইত্যাদি তে সুবিধা হয়। মদ খেয়ে সেই মানসিক আঘাতের ঘটনাটা ভুলতে চেষ্টা করে। কিন্তু মদের নেশা কেটে গেলেই আবার সেই মনের চিন্তা, অসুবিধাগুলো ফিরে আসে। এর জন্য অনেকের মদে বা অন্যান্য ড্রাগে আসক্তি হয়।

কি ধরনের মানসিক আঘাতে এই উদ্বিগ্ন ভাবের সম্ভাবনা বেশী ?

রেপ বা বলাৎকার হ’লে বেশী মানসিক আঘাতের সম্ভাবনা থাকে। এছাড়া কাউকে যদি বন্দি অবস্থায় রাখা হয়,তাকে প্রানে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়, তাহ’লে তাদের মানসিক আঘাত পাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়। শিশুদের ক্ষেত্রে তাদেরকে অবহেলা করা হয়, বা শারীরিক ভাবে অত্যাচার করা হয় তবে তাদের মনে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক আঘাত লাগতে পারে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন বন্যা, ভূমিকম্প, বা ঘরে আগুন লাগা ইত্যাদি অবস্থায় যারা পড়েছেন তাদের মধ্যে পি টি এস ডি হবার সম্ভাবনা অপেক্ষাকৃত কম।

রিফিউজি ও যুদ্ধবন্দিরা যাদের উপর শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার হয়েছে তাদের মধ্যে এই অবস্থা হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশী।

পরিসংখ্যানে দেখা গেছে যে পুরুষদের থেকে মেয়েদের পি টি এস ডি হবার সম্ভাবনা বেশী।

পি টি এস ডি বা মানসিক আঘাতজনিত উদ্বিগ্ন ভাবের কারন কি বা কেন হয় ?

এর কারন সঠিক ভাবে এখনো জানা যায় নি। তবে মনে করা হয় ( ফ্রয়েড এর মতে)মানসিক আঘাতের ফলে আগের কোন মনের দন্দ্ব যেটার সমাধান হয়নি সেই দন্দ্বের আবার পুনরুজ্জীবিত হবার জন্য এই ধরনের উদ্দিগ্নভাব হয়। মানসিক আঘাতের ফলে সে আবার শিশু বয়সের মানসিক অবস্থায় ফিরে যায় এবং মনের মধ্যে একটা সমতা আনার চেষ্টা করে। যারা মনের ভাব ভাষায় ঠিকভাবে প্রকাশ করতে পারে না (Alexithymia) তারা কোন ধরনের মানসিক চাপ (Stress) এ পড়লে মনকে তারা স্বাভাবিক ভাবে রাখতে পারে না। তাদের মধ্যে এই ধরনের উদ্দিগ্নভাব হবার সম্ভাবনা থাকে।

কেউ কেউ মনে করেন, যাদের মানসিক আঘাত লাগে তারা সেই আঘাতকে ঠিক ভাবে সামলাতে বা Process করতে পারে না। যখনই ওই ধরনের কোন মানসিক চাপ বা ওই ধরনের মানসিক আঘাতের মতো অবস্থায় আসে তখন তাঁরা সেটাকে না সামলে বা না সম্মুখীন হয়ে সেটাকে এড়িয়ে যায়।

মনে করা হয়, যখন কোন মানসিক আঘাত লাগে তখন সেই আঘাতের সাথে অন্যান্য পারিপার্শিক অবস্থার সাথে একটা যোগ বা সম্বন্ধ হয়। তার ফলে যখনই ওই ধরনের পারিপার্শিক অবস্থা আসে বা পড়ে তখনই সেই আগের মানসিক আঘাতের কথা মনে করিয়ে দেয়। সেটা মনে পড়লেই সেই আগের মতো ভয়, বা আতঙ্ক ফিরে আসে। আতঙ্কের সাথে সাথে শারীরিক উপসর্গ যেমন বুক ধড় ফড় ক্রা,মাথা ঘোরা,ঘাম হওয়া, মনে হতে থাকে জ্ঞান হারিয়ে যাবে। আবার কারো কারো মনে রাগ উত্তেজনা হয়,তখন মারমুখী হতে পারে। বেশীরভাব ক্ষেত্রে ভুক্তভুগী সেই অবস্থা থেকে নিজেকে সরিয়ে আনে। আর সেই ধরনের অবস্থাকে সব সময় এড়িয়ে চলে।

যেমন,কেউ যদি একটা ভীষন ট্রেন দুর্ঘটনা থেকে বেচেঁ গেছেন,সে ট্রেনে উঠলেই তাঁর সেই ঘটনার কথা মনে হয়ে অস্বাভাবিক উদ্বিগ্ন ভাব বা উত্তেজনা হতে পারে। এমনকি ট্রেনের আওয়াজ শুনলেও মনের মধ্যে মানসিক অস্বস্তি হতে পারে। তারজন্য সে ট্রেনে ওঠা বা ষ্টেশনে যাওয়া বন্ধ করে দিতে পারে।

এই ধরনের আঘাতে কি ব্রেন বা মস্তিষ্কে কোন চোট লাগে?

সেই সম্বন্ধে সঠিক জানা যায় নি। তবে যাদের পি টি এস ডি র মতো উপসর্গ হয়, তাদের দেহে নানা নিউরোট্রান্সমিটার  যেমন,    Norepinephrine, dopamine, ইত্যাদির পরিমাণ বেড়ে যায়। তার ফলে তাদের হার্টের গতি, রক্তের চাপ, ঘুমের অসুবিধা ইত্যাদি হতে থাকে।

এছাড়া যাদের এই ধরনের উদ্বিগ্নভাব থাকে তাদের রক্তে ও মস্তস্কে স্ট্রেস হরমোন যেমন, করটিকোট্রফিন (Corticotrophin), & Glucocorticoid hormones এর পরিমাণ বেশীরভাগ সময় বেশী থাকে।

সম্প্রতি মনে করা হচ্ছে যে ব্রেনে বা মস্তিস্কে হিপ্পোক্যাম্পাস (Hippocampus) নামে একটা অংশের পরিবর্তন হয়। ব্রেনের হিপ্পোক্যাম্পাসের  পরিমাণ কমে যায়,যদিও এটা সবার ক্ষেত্রে পাওয়া যায় নি।

নানা ধরনের পরীক্ষা নিরীক্ষার পর কোন বিশষ অস্বাভাবিকতা বা শারীরিক ক্ষতি এখনো পাওয়া যায় নি যার জন্য পি টি এস ডি ডায়াগনোসিস করা যেতে পারে।

সাধারণতঃ কি কি ভাবে এরা ডাক্তারের কাছে বা বিশেষজ্ঞের কাছে যায় ?

একটা কেস যেটা আমার ক্লিনিকে বেশ কয়েক বছর আগে এসেছিল সেটা এই রকমঃ

পঞ্চান্ন বছরের এক বিধবা মহিলাকে(নাম ধরা যাক মায়া) আমার ক্লিনিকে রেফার করেন এক স্ত্রীরোগ বিশষজ্ঞ, কারন ওই মহিলা বার বার বলছেন যে, তিনি অন্তঃসত্তা আছেন,এবং ঠিক মত গর্ভপাত করা হয়নি। স্ত্রী বিশেষজ্ঞের জানান তিনি মায়ার একবার অপারেশন করেন,যদিও তিনি করতে চাননি, কারন পরীক্ষার দ্বারা জানতে পারেন যে তিনি অন্তঃসত্তা ছিলেন না। বার বার অনুরোধ করার জন্য অপারেশন করতে হয়। মায়ার পরনে ছিল সাদা কাপড়,মাঝারি গড়নের,বেশ মানসিক ভাবে উত্তেজিত ছিলেন, আমাকে বললেন যে,মাস খানেক আগে ওনার যুবক বয়সের ছেলে কাজের সুত্রে বাড়ির বাইরে এক রাত্রে যেতে হয়েছিল, তার জন্য সে তার বন্ধুকে তাদের বাড়িতে থাকতে বলে, কারন তাঁর সব সময় কেমন একটা উদ্বিগ্নভাব সেই জন্য কেউ থাকলে হয়তো মনে জোর পাবেন। সেই ছেলের বন্ধু একই পাড়াতে বা গ্রামে থাকে,আর সবাই তাকে চেনে এবং ওই মহিলাও তাকে চেনেন বেশ কয়েক বছর ধরে। সুতরাং তার বাড়িতে থাকা নিয়ে মনে কোন সংশয় বা ভয় ছিল না।

মায়া আরো বললেন সেই রাতেই ছেলের বন্ধু তাঁর সাথে জোর করে সেক্স করে বা রেপ করে। তারপর তিনি সারা রাত ভয়ে, লজ্জায়, কোন রকমে কাটিয়ে দেন। ছেলে পরের দিন ফিরে এলেও তাকে বলতে পারেন নি। সেই থেকে মনের মধ্যে ঘুরতে থাকে যে যদি তিনি অন্তঃসত্তা হয়ে যান, যদি সেই বলাৎকারি ছেলের বন্ধু সবাইকে জানাজানি করে দেয়। তার পর মহিলা বাইরে যাওয়া বন্ধ করে দেন, মনে হতে থাকে যেন অন্তঃসত্তার উপসর্গ যেমন, বমি ভাব, দুর্বলতা, পেট ফুলে যাওয়া ইত্যাদি হতে লাগল। ঘুমের মধ্যে আতঙ্কে জেগে উঠেন, সারাদিন কাজকর্ম করতে পারেন না।

এই অবস্থাটাকে অনেকটা পি টি এস ডি র মতো, কিন্তু এটাকে সাধারণতঃ বলা হয় Acute stress disorder. (এর সঠিক বাংলা করা বেশ শক্ত) এই অবস্থাটা যদি মাসের পর মাস চলতে থাকে, এবং হয়তো পরে পি টি এস ডি বা আঘাত জনিত উদ্দিগ্নভাব বলা যেতে পারে।

আরো জানাগেল যে,মায়ার মাসিক বন্ধ হয়ে গেছে বছর পাঁচেক আগে, এবং তাঁর স্বামী মারা গেছেন প্রায় দশ বছর আগে। মায়ার অনেক আগে থেকেই উদ্দিগ্নতা ভাব ছিল, মনের মধ্যে সব সময় অজানা ভয় ভয় করতো, সেটা স্বামী মারা যাবার পর বেড়ে গেছিল। ছেলে দিনের বেলায় বাড়িতে প্রায়ই থাকে না।সে ব্যাবসার জন্য খুব ব্যস্ত থাকে। এই ঘটনার আগে মায়া কয়েকবার ডাক্তার দেখিয়ে ছিলেন। আমাদের মত দেশে যেখানে সাইকোথেরাপি বা কথার দ্বারা চিকিৎসা(টকিং থেরাপি,Talking therapy) সেই সময় হ’ত না বললেই চলে,তাই ডাক্তার শুধু ডিপ্রেশন ও টেনশন কমাবার জন্য ঔষধ দিয়েছিলেন। তাতে মায়ার সাময়িক ও আংশিক ভাবে সুস্থ্য বা ভাল ছিলেন।

ইতিহাস নিয়ে জানাগেল যে, কুমারী অবস্থায়,যখন তাঁর বয়স কেবলমাত্র তের বছর সেই সময় তাঁকে পাড়ার বা গ্রামের এক বয়স্ক ব্যক্তি দ্বারা যৌনভাবে নিগৃহীত হয়েছিলেন। সেই থেকে সব সময় মনের মধ্যে ওই ধরনের ভয় বা ভীতি ছিল। আর এই ধর্ষনের পর এই উপসর্গ শুরু হোল।

যখনই মায়া বাইরে বেরোতেন তখনই তার মনে হোত এই ব্যপারটা হয়তো ছেলেটা সবাইকে বলে দিয়েছে। সেই মনে করে মনের মধ্যে আতঙ্কের ভাব হোত। মাথা ঘোরা, বুক ধড়ফড় করা, মনে হয় যেন অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাবেন। সেই ভয়ে কখনো আর একা বাড়ির বাইরে যেতে পারতেন না। রাতে ঘুমের মধ্যে স্বপ্নের আতঙ্কে সারা রাত ঘুমতে পারতেন না,কারন রাতেই সেই রেপের কথাটা মনে পড়ে যেত।দিনের বেলায় অনেক পরিশ্রান্ত হয়ে কয়েক ঘণ্টা ঘুমতেন।

এর থেকে বোঝা যায় এই ধরনের অবস্থায় কি ধরনের উপসর্গ নিয়ে ডাক্তারের কাছে আসে। এর সম্বন্ধে আগেই লেখা হয়েছে।

কি চিকিৎসা করা হয় ?

অনেক রকমের চিকিৎসার কথা বলা হয়। বিশেষজ্ঞের মতে যখনই কোন সাংঘাতিক দুর্ঘটনা ঘটে তখন দুর্ঘটনায় যারা পড়েছেন তাদের কাউন্সেলিং বা সাইকোথেরাপি দেওয়া দরকার। তাহলে তাদের মধ্যে ভবিষ্যতে এই ধরনের উদ্বিগ্নভাব হওয়ার সম্ভাবনা কম হয়। এই ধরনের কাউন্সেলিং যারা দেবেন বা থেরাপিষ্ট তাদের স্পেশাল ট্রেনিং দরকার।

বেশীর ভাগ পি টি এস ডি রোগীদের মধ্যে আরো অন্যান্য মানসিক উপসর্গ থাকে যেমন মানসিক অবসাদ ভাব( Depression), উদ্দিগ্নভাব (Anxiety), আর বেশীরভাগ রোগীরই ঘুমের অসুবিধা হয়(যেমন ঘুম আসতে দেরী হয়, ঘুমটা ভাঙ্গা ভাঙ্গা হয়,ঘুমের মধ্যে বার বার জেগে যায়, ঘুমের মধ্যে আতঙ্ক, সকালে ঘুম থেকে জেগে মনে হয় সারা রাত ঘুমই হয় নি,সকালে ক্লান্ত ভাব লাগে)।

এর জন্য অনেক ডাক্তার যে ঔষধগুলি দেন সেগুলি হোলঃ (নীচের ঔষধগুলির সম্বন্ধে আরো জানতে হ’লে “ঔষধ সম্বন্ধে আলোচনায়” দেখুন)

১) ফ্লুওক্সোটিন (Fluoxetine ), প্যারোক্সোটিন (Paroxetine ), সিটালোপ্রাম (Citalopram ), ভেনলাফ্যাক্সিন ( Venlafaxine), সারট্রালিন (Sertraline) ইত্যাদি, এর মধ্যে সমীক্ষা করে দেখা গেছে যে প্যারোক্সেটিন ও সারট্রালিন সব চেয়ে ভাল উপকার দেয়।

২) ইমিপ্রামিন (Imipramine ), নরট্রিপ্টাইলিন (Nortriptyline ), ইত্যাদি

৩) লোরাজেপাম (Lorazepam ), ক্লোনাজেপাম (Clonazepam ), ডায়াজেপাম (Diazepam ), ইত্যাদি (এই ঔষধগুলি খুব সাবধানে দেওয়া উচিৎ, এক দু সপ্তাহের বেশী এক নাগাড়ে দিলে রোগীর ওই ড্রাগের প্রতি অ্যাডিকশন বা আসক্ত হয়ে যেতে পারে। সেই জন্য খুব জরুরি অবস্থা ,যেমন মানসিক আতঙ্ক ইত্যাদি ছাড়া দেওয়া হয় না)

সাইকোথেরাপি (Psychotherapy) বা টকিং থেরাপি (Talking therapy)

বেশীরভাগ থেরাপিতে চেষ্টা করা হয়, যে মানসিক আঘাতের জন্য উদ্বিগ্নভাব হচ্ছে সেই আঘাতের মানসিক দিক দিয়ে একটা সমাধান করা। অনেক ভুক্তভোগী সেই আঘাতকে ভুলে যেতে চান। কিন্তু তা ভুলতে পারেন না, সেই ঘটনাটাকে কখনো মেনে নিতে পারেন না, মনের মধ্যে অনেক সময় প্রতিশোধ, বা অক্ষমতা, হতাশা আসে। থেরাপিতে চেষ্টা করা হয় সেই গুলোকে মানসিক ভাবে ম্যানেজ করতে।

মনের মধ্যে যে সন্দেহ ভাব থাকে,বা কাউকে বিশ্বাস না করতে পারা, ইত্যাদিও সমাধান করার চেষ্টা করা হয়। অনেক সময় কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাসের থেরাপিতে রোগীকে সাহায্য করলে, রোগী ঠিক মত ঔষধ খেতে পারে ( কয়েকদিন ঔষধ খাবার পর অনেক সময়ই রোগীরা মনে করেন ঔষধে কিছু উপকার হবে না)ধীরে ধীরে মনের মধ্যে একটা আস্থাভাব হয়, আর মনের অবস্থার উন্নতি হতে থাকে। ঔষধ খেলে ঘুম ঠিক হবার জন্য, মনের মধ্যে ক্লান্তি ভাব কম হয়, দৈনন্দিন কাজ করতে পারেন। কাজ করতে থাকলে চিন্তা কম হয়,কাজ করে শরীরে ক্লান্তি হ’লে ঘুমও ধীরে ধীরে ভাল হতে থাকে।

যাদের ড্রাগের বা মদে আসক্তি আছে, তাদের সেই আসক্তি ছাড়ানোর জন্য বেশীদিন ধরে চিকিৎসা দিতে হতে পারে। সাইকোথেরাপি দ্বারা যখন স্ট্রেশ বা মানসিক চাপের কম হয়, তখন ড্রাগ বা মদ খাবার প্রবণতাও কমে। এমনকি সেরে ওঠার পরেও যদি কোন ধরনের আবার মানসিক চাপ, বা ছোট খাট মানসিক চোট লাগে তবে আবার আগের উপসর্গগুলো ফিরে আসতে পারে।

এই ধরনের উদ্দিগ্নভাবের কি পরিণতি হয় ?

সাধারণতঃ এই ধরনের উদ্বিগ্নভাব বা পি টিএস ডি মানসিক আঘাতের পরেই , কখনো বা এক সপ্তাহ থেকে মাস, এমনকি কয়েক বছর থেকে অনেক বছর পরে হতে পারে। উপসর্গ গুলি কম বেশি হতে থাকে,সেটা নির্ভর করে মানসিক চাপের উপর। দেখা গেছে প্রায় এক তৃতীয়াংশ ভাগ রোগী এর অবস্থা থেকে চিকিৎসা ছাড়াই সেরে উঠে। প্রায় চল্লিশভাগ রোগীর কম বা কিছু উপসর্গ হয়, কুড়ি ভাগের বেশী ভাবে ভুগতে থাকে। দশ ভাগ রোগীর অনেক দিন বা বছর ধরে এই ধরনের উপসর্গ চলতে থাকে।

দেখা গেছে খুব কম বয়সের ও বেশী বয়সে মানসিক আঘাত পেলে বেশী ক্ষতি হয়। কারন কম বয়সে মানসিক আঘাত সহ্য করার ক্ষমতা কম থাকে,আর বেশী বয়সে এই আঘাতকে মেনে নিতে পারে না কারন মনের মধ্যে কঠিন ভাব থাকার জন্য।

এছাড়াও যদি শরীরে কোন অক্ষমতা থাকে, বা মানসিক আঘাতের আগে থেকে যদি কোন উদ্বিগ্নভাব,বা অবসাদ ভাব থেকে থাকে,বা কারো যদি পারসোনালিটিতে নানা অস্বাভাবিকতা থাকে যার জন্য অন্যদের সাথে মানিয়ে চলতে অসুবিধা হয়, তাহলে তাদের ক্ষেত্রে মানসিক আঘাতের পর এই উদ্বিগ্নভাব বা টেনশন অনেকদিন ধরে চলতে থাকে।

মানসিক রোগের থেকে সেরে ওঠা

আমরা জানি যে কিছু কিছু রোগ আছে যেগুলো থেকে একদম সেরে ওঠা খুব কঠিন বা অসম্ভব। যেমন প্যারালিসিস জাতিয় স্নায়ুর রোগ, ডায়াবিটিস, প্রেসারের রোগ, কিছু কিছু হার্টের অসুখ এবং কিছু কিছু মানসিক রোগ যেমন, সিযোফ্রেনিয়া, কিছু কিছু ডিপ্রেশন ইত্যাদি থেকে সম্পূর্ণ ভাবে সেরে ওঠা বেশ কষ্টকর।

আগেকার (ট্রাডিশানাল) চিকিৎসদের মতে সেরে ওঠা মানে রোগের উপর্সগ থেকে সম্পূর্ণভাবে মুক্তি বা কোন উপসর্গ না থাকা। এই অবস্থা থেকে এখন “সেরে ওঠা”র মানের অনেক পরিবর্তন হয়েছে।

এখন সেরে ওঠা বলতে কি বোঝায়?

সেরে ওঠা মানে যে রোগের সব উপসর্গ চলে গেছে তা কিন্তু নয়। সেরে ওঠা মানে রোগী সেই আগের অবস্থায় ফিরে গেছেন তাও নয়। যেমন, ব্রেনে বা মস্তিষ্কে স্ট্রোকের ফলে দেহের কোন প্যারালিসিস হবার পর, রোগী অনেকটা সেরে উঠতে পারেন। মানে চলা ফেরা করতে পারেন, কারো সাহায্য না নিয়ে নিজের দৈন্দিন কাজ কর্ম করে নিতে পারেন, যদিও প্যারালিসিসের জন্য হাত পায়ের ক্ষমতা সম্পূর্নভাবে স্বাভাবিক হয়ে যায় না।

সেই রকমভাবে মানসিক রোগের থেকে সেরে ওঠার পর সম্পূর্নভাবে রোগের উপসর্গ থেকে মুক্তি নাও হতে পারে। যেমন, মাঝে মাঝে উদ্দিগ্ন ভাব, মন খারাপ হওয়া, বা সাইকোসিসে ভুক্তভোগী রোগিদের কানে নানারকম কথা শোনা ইত্যাদি হ’তে থাকে, যদিও সেই সব উপসর্গের মাত্রা অনেক কমে যায়। এবং রোগিরা কম বেশী কাজ কর্ম চালিয়ে যেতে বা নিজেদের সংযত রেখে স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারেন।

সেই রকমভাবে মনে করা যাক কারো হার্টের অসুখ হয়েছে, তারজন্য বাইপাস অপারেশন হয়েছে। সে ক্ষেত্রে সেই হার্টের রোগী অনেক সময়েই কয়েকমাস পরে কাজে যোগ দিতে পারেন। যদিও বেশী চাপের কাজ করলে তার অসুখের বাড়াবাড়ি হ’তে পারে।

এই ধরনের অবস্থাকেও আমরা বলে থাকি যে তারা রোগের থেকে সেরে উঠছেন।

সেরে ওঠার ব্যপারে সমাজতত্ববিদরা মনে করেন যে, সমাজ ই কাউকে মানিয়ে নিতে পারে না বা কাউকে অচল করে দেয়, এটা এমন নয় যে কারোর উপসর্গ তাদেরকে অচল বা অস্বাভাবিক করে দেয় বা তারা মানিয়ে নিতে পারে না। এই সমাজই বিভিন্ন ধরনের মানুষ জনকে এবং তাদের অক্ষমতাকে মানিয়ে নিতে পারে না। সুতরাং এর থেকে বোঝা যায় যে মানসিক রোগীর সেরে ওঠার ব্যপারে সমাজের একটা বিশেষ স্থান আছে।

আগে সেরে মানসিক রোগ থেকে সেরে ওঠার ব্যপারে কি ব্যবস্থা ছিল এবং তার কি অবস্থা এখন ?

বেশ কয়েক দশক আগে পর্য্যন্তও পাশ্চাত্য দেশে মানসিক রোগীদের বিশেষ করে যাঁরা সাইকোসিসে ভুগতেন, যাঁরা খুব অস্বাভাবিক আচরণ করতেন, নিজেদের দেখাশোনা করতে পারত না, পরিবারের লোকেরা তাদের বাড়িতে রাখতে পারতেন না , তাদেরকে মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর তাদেরকে বন্ধ অবস্থায় মানসিক হাসপাতালে না অ্যাসাইলামে রাখা হোত। এর ফলে অনেক রোগী প্রায় ঠিক হয়ে যাওয়ার পরেও যখন হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হোত তাদের পক্ষে আর সমাজে বাস করা  বেশ কঠিন হয়ে যেত। কারন অনেক বছর হাসপাতালে থাকার ফলে তাঁরা ভুলেই যেত যে কি ভাবে স্বাধীনভাবে সমাজে বাস করতে হয়।

১৯৭০ দশকের বা ঐ সময় থেকে বিভিন্ন পাশ্চাত্য দেশে মানসিক বিভাগগুলি ভাবতে শুরু করল যে কিভাবে মানসিক রোগীদের সমাজে স্বাভাবিকভাবে বাস করার উপযুক্ত করা যায়। এবং সমাজও মানসিক রোগীদের প্রতি যে একটা ভয় বা অনিশ্চয়তা বা কুসংস্কার আছে সেটা কমানো যায়।

সত্তর দশকের থেকে ধীরে ধীরে পাশ্চাত্য দেশের বিশাল বিশাল মানসিক হাসপাতাল বা প্রতিষ্ঠান গুলো বন্ধ করে দেওয়া হতে থাকে এবং আশি ও নব্বই দশকের মধ্যে বেশীর ভাগ পাশ্চাত্য দেশে অনেক সংখ্যায় কমুঊনিটি মেন্টাল হেলথ ক্লিনিক খোলা হল এবং এখনো সেই পরিবর্তন চলেছে।

এই “কমুঊনিটি মেন্টাল হেলথ ক্লিনিক” গুলি হোল অনেকটা “আউটডোর মেন্টাল হেলথ ক্লিনিক”। এখানে রোগীরা আসেন ডাক্তার দেখাতে, আর নার্স, সমাজসেবী, ইত্যাদি কর্মীরা রোগীদের নানাভাবে সাহায্য করেন স্বাবলম্বী হ’তে।

তখন থেকে বেশীরভাগ পাশ্চাত্য দেশে নানা সরকারি সমাজসেবী সংস্থা গড়ে উঠেছে বা তৈরী করা হয়েছে যাতে মানসিক রোগীরা স্বাবলম্বী হয়ে সমাজে বাস করতে পারে।

কিন্তু সমস্যা হচ্ছে এইসব সাহায্যকারী সংস্থা গড়ে উঠার আগেই বেশির ভাগ বড় বড় মানসিক হাসপাতাল বা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হোল। যে সব মানসিক রোগীরা বছরের পর বছর একটা সীমাবদ্ধ জায়গাতে কঠোর নিয়মাবলীর মধ্যে জীবন যাপনে অভ্যস্ত হয়ে হঠাৎ সমাজে মুক্তভাবে থাকতে বাধ্য করা হোল, তখনই নানা সমস্যার সৃষ্টি হোল।

যেমন, অনেক রোগীই ঔষধ খাওয়া বন্ধ করে দেওয়ার জন্য আবার অসুস্থ হ’য়ে কেউ কেউ নিজেদের ঠিকমত দৈনন্দিন কাজ কর্ম যেমন পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকা, বা  ঠিকমত খাওয়া দাওয়া করত না। তারজন্য আবার রোগের উপসর্গ গুলো আবার তীব্রভাবে দেখাদিল।

কেউ কেউ যথেচ্ছভাবে মদ্যপান, বা নানারকম ড্রাগ বা মাদকদ্রব্য ব্যবহারের ফলে মানসিক অবস্থার আরো অবনতি হোল।

যেসব রোগীর আগে থেকে আগ্রাসন বা আক্রমণাত্মক হবার প্রবণতা ছিল বা ইতিহাস আছে তাঁরা ঔষধ বন্ধ করে দেওয়ার জন্য, বা মদ ও মাদকদ্রব্য বা ড্রাগ ব্যবহারের জন্য আবার তাদের মধ্যে আগের মত রোগের বাড়াবাড়ি হবার জন্য আক্রমণাত্মক ভাব ফিরে এল। সেই জন্য তাদের অনেকেই অপরাধের জন্য মানসিক হাসপাতালের পরিবর্তে জেলে ঠাঁই হোল।

কমিউনিটি মেন্টালহেলথ ক্লিনিকগুলিতে কি কি পরিসেবা আছে?

–>ডাক্তারের পরামর্শ, যাতে রোগীর মানসিক উপসর্গগুলি মোটামুটি নিয়ন্ত্রনে থাকে। যখন একটুও অবস্থার অবনতি হয় তাহলে ডাক্তার যাতে সঙ্গে সঙ্গে নিয়ন্ত্রনে আনতে পারেন।

–>আপতকালিন বা ইমারজেন্সি ব্যবস্থা, এর দ্ধারা রোগীর বা রোগীরদ্ধারা অন্য কারো বিপদ বা ক্ষতি না হ’তে পারে।

–>প্রত্যেক রোগি না রোগিনীর জন্য একজন করে কেস ম্যানেজার থাকে, যাদের কাজ হোল সামগ্রিকভাবে রোগীকে দেখাশোনা করা, অন্য কোন সংস্থার সাথে যোগাযোগ করে রোগীদের কোনো চাহিদা থাকলে তা পূরন করার চেষ্টা করা।

–>পূর্নবাসনের জন্য রোগীদের সাহায্য করা যাতে সে আবার কাজ করতে পারে এবং আত্মনির্ভরশীল হয়।

–>যে কাজই করুক না কেন যাতে রোগীর মনে একটা আত্মসন্তুষ্টি আসে।

–>রোগীকে তাদের নানা অধিকারের জন্য সাহায্য করা।

–>রোগীরা যাতে ঠিকমত বাসস্থান পায়, ঠিকমত খেতে পায়, এবং শরীর স্বাস্থ্যের দিকটা যেন ঠিক দেখাশোনা করা হয়।

–>নির্ভয়ে ও স্বাধীনভাবে কোন ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে রোগিকে সাহায্য করা। এর জন্য রোগীকে সরকারি সাহায্যে উকিল বা আইনজীবীর ব্যবস্থা করা হয়।

এই ধরনের কমিউনিটি মেন্টাল হেলথ ক্লিনিক থাকার জন্য কি কি পরিবর্তন লক্ষ করা গেছে ওই সব দেশে?

–>স্বভাবতঃই ওইসব দেশে মানসিক রোগীদের হাসপাতালে ভর্তির দিনগুলি অনেক কমে গেছে। একমাত্র যখন কোনমতেই সমাজে রাখা যায় না তখনই তাদেরকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তারজন্য বেশীরভাগ মানসিক রোগীর অনেক উপসর্গ থাকা সত্ত্বেও হাসপাতালের বাইরে থেকে চিকিৎসা নিতে পারেন। এরজন্য খরচের যে কিছু কমতি হয়েছে কিনা আমার জানা নেই।

–>রোগিরা সমাজে থেকে সেরে উঠলে তাদের সমাজের সাথে মানিয়ে নিতে সুবিধা হবে এবং তাঁরা স্বচ্ছন্দে থাকতে পারবেন।

–>তাছাড়া যাদের আগে আক্রমণাত্মক হবার ইতিহাস আছে তাদেরকে ঠিকমত দেখাশোনার জন্য এই বিপদজনক ভাবও অনেক কমে যায়।

–>তাদের কাজ করার প্রবণতা বাড়ে। কিছু কিছু দেশে যেমন, ইংল্যান্ড, ইউরোপের ইত্যাদি দেশগুলিতে যেখানে রোগিরা ভাতা পান, (যেমন, Disability allowance, sickness benefit) তাদের মধ্যে অনেক সময় কাজ না করার প্রবণতা দেখা যায়। সম্প্রতি ওইসব দেশে এই নিয়ে বিশেষভাবে ভাবতে শুরু করেছে কিভাবে অনেক বেশি রোগিকে কাজে যোগ দেওয়ানো যায়।

–>অনেক রোগীই আছেন যারা মনে করেন তাদের কোন অসুখই নেই বা কোন সমস্যা নেই।তাদের জন্য মেন্টাল হেলথ সেন্টারে বিশেষভাবে দেখাশোনা করা হয়, যেমনবাড়ি বাড়ি গিয়ে রোগীদের ঔষধ দেওয়া, 

–>যারা নিজেদের ঠিকমত দেখাশোনা না করে তাদের জন্য এমনকি কাজের লোকের সাহায্যে তাদের বাড়ি ঘর পরিষ্কার করা, জামাকাপড় কাচা ইত্যাদিতে সাহায্য করা। এক কথায় প্রাচ্য দেশগুলিতে অনেক সময় পরিবারের লোকেরা রোগীর দেখাশোনার জন্য যা করে থাকেন তাই তাঁরা করেন।

–>প্রচার পুস্তিকা দ্বারা নার্স বা সমাজসেবীরা রোগীর পরিবার বা সমাজের লোকজনদের মানসিক রোগ সম্বন্ধে জ্ঞান বাড়ানো, নানা ভুল ধারনা দূর করা ইত্যাদিও করা হয়। এতে করে পাশ্চাত্যদেশে মানসিক রোগ সম্বন্ধে অনেকের অনেকের অনেক ধারনা পালটে গেছে।

প্রাচ্যদেশে মানসিক রোগের থেকে সেরে উঠা সম্বন্ধে কি ধরনা?

মানসিক রোগের থেকে সেরে উঠার ব্যপারে প্রাচ্যের দেশ যেমন ভারত, বা অন্যান্য দক্ষিন এশিয়ার দেশগুলিতে মতামত পাশ্চাত্যদেশের থেকে ভিন্ন।

পাশ্চাত্য দেশে সেরে ওঠা মানে স্বাবলম্বী হয়ে, বিশেষ করে পরিবার, আত্মীয় স্বজনের সাহায্য ছাড়া ভালভাবে থাকা।

কিন্তু প্রাচ্যের দেশ যেমন ভারতে সেরে উঠা মানে পরিবারের সকলে রোগীর সাথে বেশী যোগাযোগ রাখবে, রোগিকে সেরে ওঠার ব্যপারে, আধ্মাত্বিকভাবে সাহায্য করবে, আর রোগির স্বাবলম্বী হওয়া বা দায়িত্ববোধের প্রতি কমজোর দিতে হবে

–>যেমন, কারো সিযোফ্রেনিয়া বা কোন ধরনের সাইকোসিস হয় তাহলে পরিবারের অন্য সবাই রোগীকে সাহায্য করবে, যদিও রোগি সেটা না চাইলেও, নানা আধ্মাত্বিক কাজ কর্মের সাথে যোগ দেওয়ার চেষ্টা করা হবে। সামাজিক দায়িত্ব যেমন, ছেলেমেয়েদের দেখাশোনা করা বা পরিবারের কোন সিদ্ধান্তের ব্যপারে রোগিকে অব্যহতি দেওয়া যাতে রোগীর মানসিক চাপ কম হয়।

–>সেই জন্য দেখা যায় আমাদের মত দেশে রোগীরা পরিবার বা ফ্যামিলির প্রতি খুব নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। অবশ্য যেহেতু আমাদের মত উন্নতিশীল দেশে সোসাল ওয়েলফেয়ার বা সরকারি সাহায্য বলে বিশেষ কিছু নেই, সেজন্য এতাই বোধ হয় সব চেয়ে স্বাভাবিক এবং সহজ। 

–>আর যদি পরিবারের প্রধান রোজগেরে মানসিক রোগের জন্য কাজ না করতে পারে তাহলে সেই পরিবারের অন্যদের দুর্দশার অন্ত থাকে না। কারন তাদের জন্য সরকারের কোন ব্যবস্থা বা সাহায্য নেই।

তাই সেরে ওঠা মানেঃ মোটামুটি উপসর্গ থেকে মুক্তি এবং পরিবারের সঙ্গে মানিয়ে চলা, যদিও তার সামাজিক দায়িত্ব(রোজগার করা, নানা সিদ্ধান্ত নেওয়া) ইত্যাদি থেকে পরিবার মুক্তি দিয়ে দেয়, যদিও রোগী বা রোগিণী সেটা নাও চাইতে পারেন।

মানসিক রোগীদের সেরে ওঠার বা পুর্নবাসনের ব্যপারে কিছু কিছু মানসিক রোগীদের ধারনা নীচে দেওয়া হ’ল (এইগুলি পাশ্চাত্যদেশে রোগীদের প্রশ্নকরে জানা গেছে)—

>    “সেরে ওঠা মানে আবার যে অবস্থায় ছিলাম সে অবস্থায় ফিরে যাওয়া, কিন্তু আমার অভিজ্ঞতা আমাকে পালটে দিয়েছে”

>“আমার সব সময় এই মানসিক সমস্যা থাকবে, তার মানে আমি কোনদিন এর থেকে সেরে উঠব না”

>“আমি মনে করি আমার কোন মানসিক রোগ নেই, কিন্তু সেরে ওঠা মানে আমার মনে হবে আমার মানসিক রোগ ছিল”

>আমি মনে করি না আমার পাগলামি আমি চাই না (undesirable ), সেজন্য কেন তার থেকে সেরে উঠতে হবে?”

>“সেরে ওঠা মানে সব উপর্সগ গুলিকে ধামাচাপা দেওয়া, কিন্তু আমি আমার মনের কষ্টকে চাপা দিতে চাই না”

মানসিক রোগ থেকে সেরে ওঠার বর্তমান মানে কি ?

সেরে ওঠার ব্যপারে নানা জনের নানা মত, ডাক্তার রা এক রকম ভাবেন, রোগীরা এক রকম ভাবেন, আর সমাজসেবীরা আর এক রকম ভাবেন।

ডাক্তারি ভাষায় সেরে ওঠা( Clinical Recovery): ডাক্তারি ভাষায় সেরে ওঠা মানে যে রোগ হয়েছে, তারজন্য যে অস্বাভাবিক অবস্থা হয়েছে বা যে সব উপসর্গ হয়েছে সে সবের থেকে সম্পূর্নভাবে মুক্তি। মানে কারো যদি ম্যালেরিয়া হয়েছে তার উপসর্গ ও জিবানু থেকে সম্পুর্নভাবে মুক্তি। মানে সিযোফ্রেনিয়াতে যদি কেউ কানে নানা কথা বার্তা শোনে, বা অস্বাভাবিক আচরণ করে তবে ধরে নিতে হবে সে সেরে ওঠেনি যদিও সে মোটামুটি নিজের দেখাশোনা ও কাজকর্ম চালিয়ে নিতে পারে।

ব্যক্তিগতভাবে সেরে ওঠা ( Personal recovery):

এর মানে হ’ল কেউ যদি নিজের ব্যক্তিগত সত্ত্বা, সেটা হয়ত কিছুটা বদলে গেছে রোগের জন্য, এবং সে নিজেকে তার সাথে মানিয়ে নিজের জীবনকে পরিবর্তিত ভাবে চালিয়ে নিচ্ছে, যদিও তার সব উপর্সগ থেকে সম্পূর্নভাবে মুক্তি হয়নি।

কেউ কেউ মনে করেন সেরে ওঠা একটা জীবনের ধারা, এর দ্বারা দৈন্দিন নানা চ্যালেঞ্জকে মোকাবিলা করা বা ম্যানেজ করা। এই সেরে ওঠা একটা সরল রেখারমত নাও হ’তে পারে। কখনো কখনো এটা ব্যর্থতা বা পিছু হটাও হতে পারে। আবার সব কিছু একত্র করে নূতন করে অক্ষমতাকে পেরিয়ে গিয়ে এগিয়ে যাওয়া। এতে মনে ইচ্ছা থাকবে বেচেঁ থাকার, কাজ করার এবং সমাজকে ভালবেসে সমাজের জন্য কিছু করা।

Reference:

New Oxford text book of psychiatry: published 2009.

Mental health in India, 1950-2000, Edited by Prof. R. Srinivasa Murthy.

Website: WWW.Wikipedia

পরাধীন ভারতে মানসিক হাসপাতাল ও চিকিৎসা পদ্ধতি

পরাধীনতার আগে ভারতে মানসিক চিকিৎসার বিশেষ কিছু জানা যায় নি, এবং যত দূর মনে হয় কয়েকশ বছর আগে, ভারতেও অন্যান্য দেশের মত রোগীদের এক জায়গায় বন্ধ রাখা হোত। তার প্রধান কারণ হয়তো রোগীর অস্বাভাবিক আচরণের জন্য বা অন্যদের মারমুখী রোগীদের থেকে রক্ষা করতে। যদিও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা বেশ কয়েক হাজার বছরের পুরানো বা প্রচলিত থাকা সত্ত্বেও সেই চিকিৎসা পদ্ধতি কতটা মানসিক রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়েছে তা সম্বন্ধে আমার বিশেষ জানা নেই। মানসিক চিকিৎসার পদ্ধতি আমাদের দেশে মনে করা হয় প্রধানতঃ ব্রিটিশরা ই আমদানি করেছে। যদিও মনে করা হয় ব্রিটিশদের আগে, পর্তুগিজরা গোয়াতে তাদের শাসনকালে প্রথম পাশ্চাত্য মানসিক চিকিৎসা পদ্ধতির প্রচলন করেন।

১৭০৭ সালে মুঘল সম্রাট আওরংজেবের মৃত্যুর পর, সারাদেশে একটা ক্ষমতার শূন্যতার সৃষ্টি হয়, তখন বৃটিশরা যেন তেন প্রকারে, সেই ক্ষমতার শুন্যতাকে পূর্ন করে তাদের ক্ষমতার প্রতিষ্ঠা করে। ধীরে ধীরে বিভিন্ন প্রদেশে ক্ষমতা দখল করে তাদের সাম্রাজ্যের পরিধি বাড়াতে থাকে। ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধের পরাজয়ের পর, বাংলা পরাধীন হয় এবং বৃটিশ সাম্রাজ্যের তখন পাকাপাকি ভাবে প্রতিষ্ঠা হয় ভারতবর্ষে।

জবচার্নক, ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর একজন কর্মচারী, কোলকাতার প্রবর্তন করেন, প্রায় সেই সময়, এবং কোলকাতা শহর ধীরে ধীরে বড় হ’তে থাকে, আর ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর প্রভাব সারা দেশে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। ১৭৭৪ সালে ওয়ারেন হেষ্টিংস বাংলার গভর্নর হন। তখন ব্যাবসা বানিজ্য, সাম্রাজ্যের পরিচালনা, এমনকি যুদ্ধ বিগ্রহ সব কিছু পরিচালিত হ’তে থাকে কোলকাতা থেকে। সেই সময় বৃটিশরা ভাবতে শুরু করেন কোলকাতায় একটা মানসিক হাসপাতালের প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনিয়তা।

সরকারি উদ্যোগে প্রথম মানসিক হাসপাতাল পি জি হাসপাতালের পেছনে কোলকাতায় স্থাপিত হয় ১৭৮৭ সালে। ডাক্তার উইলিয়াম ডিক, ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সার্জেন ওই হাসপাতালের সুপারিনটেন্ড ছিলেন ১৮১৮ সাল পর্য্যন্ত। ডাক্তার ডিকের অবসর নেওয়ার ফলে ওই হাসপাতালের অবস্থার খুব অবনতি হয়ে যাওয়াতে সরকার ১৮২১ সেটা বন্ধ করে দেন। এছাড়াও ওই হাসপাতালের এক কর্মচারি মিষ্টার বিয়ার্ডমোর ১৮১৭ সালে পি জি হাসপাতালের সীমানার বাইরে প্রাইভেটে আর একটা মানসিক হাসপাতাল খোলেন। এই ধরনের হাসপাতালে কেবল মাত্র ইউরোপিয়ান মানসিক রোগীর চিকিৎসা করা হোত।

মাদ্রাজ বা তামিলনাড়ুতে প্রথম মানসিক হাসপাতাল স্থাপিত হয় ১৭৯৪ সালে , মনে করা হয় এটাই বোধহয় সব চেয়ে পুরানো মানসিক হাসপাতাল।

১৮৫৮ সালে ভারতের শাসন ব্যবস্থা যখন ব্রিটিশ ক্রাউন এর হাতে গেল তখন থেকে নানা পরিবর্তন হতে লাগল, যেমন প্রথম লুন্যাসি অ্যাক্ট (১৮৫৮ সালে) চালু হোল।

তারপরে কয়েকদশক থেকে ছটা মানসিক হাসপাতাল পূর্ব ভারতে স্থাপিত হল, যেমন, কোলকাতার ভবানিপুরে ইউরোপিয়ান লুন্যাটিক অ্যাসাইলাম(১৮১৭ সালে), তাছাড়া ঢাকা, পাটনা, দুলান্দা ( কোলকাতা), বেরহামপুর ও কটক (উড়ীষ্যা)। ঢাকার মানসিক হাসপাতালটিকে ১৮৭৬ সালে তেজপুরে (আসাম) সরিয়ে নেওয়া হোল যখন আসামকে বাংলা থেকে ১৮৭৪ সালে আলাদা করা হোল।

এই ভাবে ধীরে ধীরে দেশের অন্যপ্রান্তেও হাসপাতাল গড়ে উঠতে লাগল। যেমন, ১৮৬৫ সালের মধ্যে পশ্চিমভারতে ছটা মানসিক হাসপাতাল তৈরী হোল একটি করে প্রত্যেক শহরে যেমন, কোলাবা, পুনা, ধারোয়ার, আহমেদাবাদ, রতনাগীর এবং হায়দ্রাবাদে (পাকিস্থানের সিন্ধ শহরে)।

দক্ষিণভারতে যেমন, ওয়াল্টেয়ার, এবং তিরুচিরাপল্লিতে স্থাপিত হোল একটি করে হাসপাতাল ১৮৭১ সালে। মধ্যভারতে জব্বলপুর, ও বেরার এ একটি করে ১৮৬৬ সালে, উত্তরভারতে বেনারসে(১৮৫৪ সালে), আগ্রাতে (১৮৫৮ সালে), বেরিলিতে (১৮৬২ সালে), মানসিক হাসপাতাল স্থাপিত হোল। পাঞ্জাবে মহারাজ রঞ্জিত সিংহ এর আমলে ১৮৪০ সালে প্রথম মানসিক হাসপাতাল চালু হয়।

মানসিক হাপাতালের সংখ্যা বাড়লেও, সেই সব হাসপাতালে পরিসেবার খুব দ্রুত অবনতি হতে লাগল, এমনকি ১৯ শতকের শেষের দিকে বেশীরভাগ হাসপাতালেই মানুষের থাকার পক্ষে অনুপযুক্ত হয়ে উঠেছিল।  

মানসিক রোগীদের মানবিক ভাবে চিকিৎসা (শৃঙ্খল থেকে মুক্তি)

আট শতাব্দি থেকে তের শতাব্দী পর্‍্য্যন্ত আরব দেশগুলিতে যেমন ইরাকের বাগদাদ, সিরিয়ার দামাস্কাস, ইজিপ্টের কায়রো, ইত্যাদি জায়গায় চিকিৎসালয় ও মেডিক্যাল কলেজ ইউরোপের থেকে অনেক আগেই স্থাপিত হয়ে ছিল। সেখানে মানসিক রোগীরা ইউরোপের অনেক আগে থেকেই মানবিকতার সাথে চিকিৎসা পেয়েছিল।

ইউরোপে যদিও রেনেস্যাস চলছিল তখনো মানসিক রোগীদের চিকিৎসার ব্যপারে কোন পরিবর্তন আসেনি, সেটা হ’তে শুরু হোল আঠারো শতাব্দীর শেষের দিক থেকে। মনে করা হয়, ফরাসি বিপ্লবের পর যেন স্বাধীনতা, মানবিকতা, ইত্যাদি ধীরে ধীরে সাধারন জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে যেতে লাগল।

সেই সময় ফ্রান্স, ইটালি, বেলজিয়াম ইত্যাদি দেশে আঠারো দশকের শেষ দশকে মানসিক রোগীদের কোন ধরনের বেধেঁ রেখে চিকিৎসা করা বন্ধ করা হোতে লাগল। সেটা ধীরে ধিরে আমেরিকা, ও অন্যান্য পাশ্চাত্য দেশেও ছড়িয়ে পড়ল। পরাধীন ভারতেও সেই সময় মানিসিক হাসপাতাল গুলো গড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে সেখানেও রোগীকে কোন রকম না বেধেঁ, বা বদ্ধ জায়গায় না আটকে রেখে চিকিৎসার চেষ্টা শুরু হোল। কিন্তু বাস্তবে সেটা কত দূর মানা হোত তা আমার জানা নেই। তাছাড়া বাড়িতে মানসিক রোগীদের বেধেঁ রাখা, তখন যেমন ছিল, এখনো তেমন কম বেশী করে হয়।

ভারতে সেই সময় ইউরোপিয়ান রোগীদেরই কেবলমাত্র মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করা যেত। তাদেরকে কোন ধরনের বেধেঁ রাখা হোত না, কিন্তু দেশীয় বা নেটিভ মানসিক রোগিকে বেধেঁ রাখার প্রচলন বেশী ছিল, যদিও রিপোর্টে বলা হোত নেটিভ মানসিক রোগীরা ইউরোপিয়ান রোগীদের থেকে বেশী শান্ত প্রকৃতির।  যদি ইউরোপিয়ান রোগীদের বাধঁবার দরকার হোত তবে তাদেরকে বাধাঁর জন্য ইউরোপিয়ান কর্মীর প্রয়োজন হোত, তা না পাওয়া গেলে তাদেরকে বেধেঁ না রেখেই চিকিৎসা করা হোত। তার কারণ ইউরোপিয়ানরা নেটিভদের দ্ধারা বেধেঁ রাখা কে অপমান জনক মনে করত।  যদিও তার উল্টোটা প্রায়ই হোত।

পরিসেবায় পক্ষপাতিত্ব ও হাসপাতালের দুরবস্থা

সামাজিক স্তর অনুযায়ী ইউরোপিয়ান রোগীদের প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেনিতে ভাগ করা হোত। প্রথম শ্রেনীর রোগীরা প্রত্যেকে নিজের নিজের ঘরে থাকতো এবং খাবার সময় এক সাথে ডাইনিং টেবিলে বসে খেতো। আরা যাদের মানসিক অবস্থা খারাপ তাদেরকে বিশেষ সুরক্ষিত স্থানে রাখা হোত, এবং তাদের দেখা শোনা করতো কেবলমাত্র ইউরোপিয়ান এবং অ্যাংলো ইন্ডিয়ান কর্মিরাই।

খাবার সম্বন্ধে জানা যায় যে, ইউরোপিয়ান রোগিদের খাবার অনেক ভাল এবং ব্যালেন্সড, আর তার জন্য খরচ বরাদ্দ ছিল প্রতি মাসে ১০০ টাকা। আর সেখানে নেটিভ রোগীদের জন্য ১৮৪৪ সালে প্রতিদিন এক টাকা খরচ করা হোত ১৬ টা রোগীর জন্য। সুতরাং তার ফল স্বরূপ নেটিভ রোগীদের মধ্যে নানা রোগ দেখাদিত, এবং তাদের মধ্যে মৃত্যুর হার ও বেশি ছিল।

এছাড়া সব হাসপাতালে বেডের তুলনায় অনেক বেশি রোগী ভর্তি করা হোত। যেমন, পিজি হাসপাতালের কাছেই, এখন যেখানে পুলিশ ট্রেনিং স্কুল সেখানে সরকার ১৮৪৭ সালে ১৫০ শয্যার একটা মানসিক হাসপাতাল করেন, সেখানে ১৮৭১ সালে তার রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৫০। আর সেখানে ক্রিমিনাল রোগী ও যাদের কোন ক্রিমিনাল কাজের ইতিহাস নেই, তাদেরকে এক সঙ্গে রাখা হয়।

এছাড়া বেশীর ভাগ নেটিভ হাসপাতালে রোগীদের গাদাগাদি করে স্যাতস্যেতে মেঝেতে শুতে হোত। তারজন্য অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ত, তাছাড়া রোগীদের মধ্যে এমনকি মৃত্যুর হার পর্য্যন্ত বেশী ছিল।

মানসিক রোগীদের ইংল্যান্ডে পাঠিয়ে চিকিৎসা

এটা সাধারণতঃ ইউরোপিয়ান রোগীদের ক্ষেত্রেই করা হোত। সেই সব রোগীদের জন্য “রয়েল ইন্ডিয়া অ্যাসাইলাম” নামে লন্ডনে এক হাসপাতালে ১৮৭০ সাল থেকে রাখা হোত। যদি কোন মানসিক রোগীর অবস্থার উন্নতি ছমাসের মধ্যে না হোত তবে তাদেরকে ইংল্যান্ডে পাঠান হত। বলা বাহুল্য সেখানে কোন নেটিভদের পাঠানো হোত না, যদিও এক বার ভুল করে পাঁচ জন নেটিভ রোগীকে পাঠান হয়। তার পরেই ইংরাজ সরকার কঠোর নিয়ম চালু করেন। অবশ্য রয়েল ইন্ডিয়া অ্যাসাইলাম ১৮৯১ সালের শেষের দিকে বন্ধ করে দেওয়া হয়।

কি ধরনের চিকিৎসা দেওয়া হোত?

সেই সময় বিশেষ কোন মানসিক রোগের ঔষধ ছিল না বললেই চলে। আর কি চিকিৎসা দেওয়া হোত তার বিশেষ কোন উল্লেখও ছিল না সেই সব রিপোর্টে। উনিশ দশকের প্রথম দিকে ডাক্তাররা মনে করতেন যে, ভাল খাবার, ও শারিরিক ব্যয়ামই সব চেয়ে ভাল ঘুমে সাহায্য করে। ১৮৫৫ সালের সময়ে মরফিন বা আফিং এবং গরম জলে স্নান চিকিৎসার জন্য ব্যবহার করা হোত।

জোকের দ্ধার দেহের থেকে রক্ত ক্ষরণ ছিল আর একটা চিকিৎসা পদ্ধতি। তাছাড়া যেসব রোগী ক্রনিক বা অনেক দিন ধরে ভুগছে, তাদের দেহে ফোস্কা করে (ঘাড়ে) চিকিৎসা। ডাক্তাররা তখন মনে করতেন যে ফোস্কা দিয়ে মনটাকে মনের দুঃখ বা কষ্ট থেকে সরিয়ে আনলেই হয়ত রোগীর মনটা ভাল হবে।

১৮৬২ সালে পরীক্ষা করে দেখা যায় যে মানসিক উত্তেজনা বা অনিদ্রার চিকিৎসায় পেটের উপর সর্ষের পুল্টিশ দিলে উপকার হয়।

সেই সময় সোডিয়াম ব্রোমাইড দিয়ে মৃগী রোগের চিকিৎসা করা হয়। মৃগী রোগের চিকিৎসায় বারবিচিউরেট (Barbiturate) দিয়ে চিকিৎসা শুরু হয় ১৯০৩ সালে।  

সেই সময়(১৮৭৩ সালে)ডাক্তার পেইন, যিনি হলেন ইউরোপিয়ান লুনাটিক অ্যাসাইলাম এর সুপারিন্টেন্ড মনে করতেন যে কয়েক পেগ রাম দিয়ে রোগীর মানসিক উত্তেজনাকে কমানো যেতে পারে।

উনিশ শতকের শেষদিকে Electricity current” দিয়ে চিকিৎসা শুরু হয় নেটিভ মানসিক হাসপাতালে। সেখানে স্ট্যাটিক ইলেক্ট্রিসিটি দিয়ে রোগীর দেহের নানা জায়গায় শক দেওয়া হোত। এই পদ্ধতি খুব বেদনাদায়ক ছিল এবং এই চিকিৎসা, ১৯৩৮ সালে যেটা Cerletti and Bini দ্ধারা চালু করেন তার থেকে অনেক আলাদা। ডাক্তার পেইন তার রিপোর্টে (১৮৭৩ সালে)লেখেন যে, এই শক থেরাপিতে রোগীর অনেক উপকার হোত। এটা উল্লেখযোগ্য যে, এই ধরনের শক থেরাপি ডাক্তার পেইন অবশ্য ইউরোপিয়ান রোগীদের উপর করেন নি।  

কাজের মাধ্যমে চিকিৎসা

মনে করা হয় কাজের মধ্যে ব্যস্ত থাকলে হয়ত মনের কষ্ট বা দুঃখ কমে যায়। আবার আমার জানি যে কাজ না করলে, বা কোন কিছু না করলে সেটা যা কিছু হোক যেমন, ঘরের দৈনন্দিন কাজ, খেলা ধুলা করা, বা গান বাজনা করা, এমনকি বই পড়া, ইত্যাদি করলে মনের অবস্থার উন্নতি করতে অনেক সাহায্য করে।

আশ্চর্যের বিষয় কাজের দ্বারা মনের উন্নতি সেটা বেশী করে নেটিভ বা দেশীয় রোগীদের ক্ষেত্রে কাজে লাগান হয়েছিল, কারণ ইউরোপিয়ান অ্যাসাইলামের সুপারিন্টেন্ডেন্ট মনে করতেন যে, বাইরের তীব্র রোদে কাজ করলে ইউরোপিয়ান রোগীদের ক্ষতি হবে।

যেমন বোনা, সেলাই, ইত্যাদি কাজ গুলো নেটিভ ও ইউরোপিয়ান মেয়ে রোগীরা সহজ ভাবে করতো, কিন্তু বাইরেরে কোন কাজ বা খেলাধুলা পুরুষ রোগীরা সাধারণতঃ করতে চাইতো না। ১৮৬৩ রিপোর্টে বলা হয়েছে যে, নেটিভদের রোগীদের সরকারি পয়সা খরচা করে লেখ পড়া শেখানোর কোন দরকার নেই, কারণ সেটা তাদের জীবনে কোন কাজে আসবে না, সুতরাং সেটা হবে অর্থের অপচয়।

কি ধরনের আমোদের ব্যবস্থা ছিল?

জায়গা কম থাকার জন্য, খেলাধুলা বা আমোদ আলহাদের ব্যবস্থা খুবই কম ছিল। ১৮৬২ সালের রিপোর্টে লেখা হয়েছে যে, ঢাকা অ্যাসাইলামে রাত্রে খাবার পরে, নানা রকম ভারতীয় বাজনা বাজানো, বা নানা ইন্ডোর খেলা হোত। তাছাড়া রোগীদের পান, তামাক ইত্যাদি দেওয়া হোত, ও তাস খেলার ব্যবস্থাও ছিল।

সেই সময় (১৮৬০ এর শেষের দিক থেকে ১৮৭০ এর প্রথমদিকে) ঢকা অ্যাসাইলামে পরিচালন কমিটি ঠিক করল যে, কিছু রোগীকে শহরের মাননীয় পরিবারের কাছে রাখা, যাতে করে রোগীরা হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়ার পরে

নিজেদের পরিবারে মানিয়ে নিতে অসুবিধা না হয়।  তারজন্য খরচ বাবদ পরিবার পিছু মাসে পাঁচ টাকা করে দেওয়া হোত। কিন্তু এই ব্যবস্থা বেশীদিন চলে নি, কারণ পরিবারকে রোগীর পালানোর ব্যপারে দায়ী করা হোত বলে। কোন পরিবারই রোগীর পালানোর দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করায় সেই ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে গেল।

প্রথমদিকে মানসিক হাসপাতালের পরিচালন ভার ছিল কারাবিভাগের উপর। বিংশ শতাব্দীর প্রথম থেকে মানসিক হাসপাতালগুলির নানা সমস্যা, ও অব্যবস্থ্যার কথা সমাজে আলচনার ফলে, সে গুলো বৃটিশ পারলামেন্টে পর্যন্ত্য পৌছালো। তখন বৃটিশ পারলামেন্টে ঠিক করা হোল যে মানসিক হাসপাতালগুলোর পরিচালন ভার কারাবিভাগের কাছ থেকে সরিয়ে নিয়ে সিভিল সার্জেনের(বর্তমানে যাকে বলা হয় জেলা স্বাস্থ্য আধিকারিক, বা সি এম ও এইচ) হাতে দেওয়া হোল। প্রায় সেই সময়েই মানসিক চিকিৎসকের উপর ভার দেওয়া হোল মানসিক রোগীদের চিকিৎসার জন্য।

১৯১২ সালে মানসিক রোগীদের চিকিৎসার জন্য ইন্ডিয়ান লুনাসি অ্যাক্ট (১৯১২) চালু হোল। তারজন্য ইউরোপিয়ান পেশেন্টদের জন্য, স্থাপিত হ’ল সেন্ট্রাল লুনাটিক অ্যাসাইলাম, যেটা পরে বন্ধ হয়ে যায়, এবং তার জায়গায় স্থাপিত হয়, রাঁচি অ্যাসাইলাম ১৯১৮ সালে। (এখন সেটার নাম, রাঁচি সেন্ট্রাল ইন্সটিটিউট অব সাইকিয়াট্রি)।

তারপর থেকে মানসিক হাসপাতাল বা অ্যাসাইলাম গুলোর অবস্থা খুব তাড়াতাড়ি অবনতি হতে লাগল, ১৯৪৬ সালে “ ভোর কমিটির রপোর্ট” থেকে জানা যায় যে, সেই সময় কম করে ১৯টি মানসিক হাসপাতাল ছিল এবং মোট বেডের সংখ্যা ছিল ১০,১৮১। প্রায় সব হাসপাতালের চিকিৎসার বিশেষ ব্যবস্থা ছিল না, কেবল রোগীদের কে শুধু আটকে রাখার ব্যবস্থাই ছিল। তাছাড়া নার্সের, ডাক্তার, ও অন্যান্য স্টাফ বা কর্মির অভাব ছিল।

স্বাধীনতার পর থেকে মানসিক হাসপাতালের সংখ্যা ধীরে ধিরে বাড়তে থাকে, যেমন ১৯৪৭ সালে যেখানে হাসপাতালের সংখ্যা ছিল ৩১, সেটা ১৯৮৭ বেড়ে গিয়ে দাড়াল ৪৫।

তার পরবর্তি সময়ে জেনারেল হাসপাতাল গুলিতে মানসিক বিভাগ খোলা হতে লাগল, যার জন্য মানসিক হাসপাতাল গুলোর যেন অবহেলিত হয়ে আগের মতই রয়ে গেল। অবশ্য এখন অনেক প্রাইভেট চিকিৎসার ব্যবস্থা হয়েছে, যদিও সেটা সাধারনের জন্য সেই পরিসেবা প্রায় আওতার বাইরে রয়ে গেছে।

Reference:

Mental hospitals and healing practices in colonial India, By Prof G Bannerjee (2001) Ex Prof of psychiatry (NRS medical college, Kolkata, India); source: www.psyplexus.com

New Oxford text book of psychiatry: published 2009.